বৃহস্পতিবার, জুলাই ৩০, ২০২৬

৩০০ কোটি টাকার কারসাজির অ’ভিযোগের পর আবারও আলোচনায় এমারল্ড অয়েলের শেয়ার

দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলমান অস্থিরতার পেছনে আলোচিত নামগুলোর মধ্যে রয়েছেন মো. মামুন মিয়া। এর আগে শেয়ারবাজারে কারসাজির মাধ্যমে অন্তত ৩০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে তার ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। এবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত ‘জেড’ ক্যাটাগরির প্রতিষ্ঠান এমারল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের শেয়ারদরে অস্বাভাবিক উত্থানকে ঘিরে আবারও সক্রিয় হয়েছে একই চক্র—এমন অভিযোগ উঠেছে বাজারসংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য (পিএসআই) প্রকাশ ছাড়াই মাত্র সাত কার্যদিবসে কোম্পানিটির শেয়ারের দর ১৬ টাকা ৬০ পয়সা থেকে বেড়ে ২৪ টাকা ৮০ পয়সায় পৌঁছায়। ২০ মে থেকে ৪ জুনের মধ্যে শেয়ারটির মূল্য বৃদ্ধি পায় ৮ টাকা ২০ পয়সা বা প্রায় ৪৯ দশমিক ৪০ শতাংশ।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন, ব্যবসায়িক কার্যক্রম বা আর্থিক অবস্থার কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের ঘোষণা ছাড়াই এ ধরনের মূল্যবৃদ্ধি স্বাভাবিক নয়। তাদের মতে, এটি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে পুনরায় কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়ানোর একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা হতে পারে।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এবং দুর্বল মৌলভিত্তির একটি কোম্পানির শেয়ারের এমন অস্বাভাবিক উত্থান নতুন করে কারসাজির আশঙ্কা তৈরি করেছে। তাদের ধারণা, অতীতের মতো এবারও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের উচ্চ দামে শেয়ার কিনতে উদ্বুদ্ধ করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

২০২৩ সালের কারসাজির পুনরাবৃত্তি?

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে হলে ২০২৩ সালে এমারল্ড অয়েলের শেয়ার নিয়ে সংঘটিত ঘটনাগুলো বিবেচনা করা জরুরি।

ওই বছরের ১ এপ্রিল থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত মাত্র তিন মাস ১০ দিনের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ারের দর ৩১ টাকা ৬০ পয়সা থেকে বেড়ে ১৮৮ টাকা ৮০ পয়সায় পৌঁছায়। সে সময় মিনোরি বাংলাদেশ লিমিটেডের পক্ষ থেকে জাপানে ব্রান অয়েল রপ্তানি, বিদেশি বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক অগ্রগতির তথ্য মূল্য সংবেদনশীল তথ্য হিসেবে প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে এসব তথ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে এসব তথ্যের অনেকগুলোর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একই সময়ে বানোয়াট আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি, বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানের নামে কাল্পনিক মুনাফা দেখানো এবং অন্তর্বর্তী লভ্যাংশ ঘোষণার মাধ্যমে শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হয়। বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এ সুযোগে মিয়া মামুন ও তার সহযোগীরা উচ্চমূল্যে শেয়ার বিক্রি করে অন্তত ৩০০ কোটি টাকা বাজার থেকে তুলে নেন।

এরপর মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে শেয়ারের দর ১৮৮ টাকা থেকে ৭৪ টাকায় নেমে আসে। কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা প্রকাশ পাওয়ার পর শেয়ারের দামে আরও বড় ধস নামে। এতে হাজার হাজার সাধারণ বিনিয়োগকারী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন বলে দাবি করা হয়।

মিনোরি বাংলাদেশকে ঘিরে প্রশ্ন

এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, মিনোরি বাংলাদেশ লিমিটেড ২০১৭ সালে বাংলাদেশি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয়। প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মামুন মিয়া এবং অপর পরিচালক আবুল কালাম আজাদ—উভয়েই বাংলাদেশি নাগরিক। ফলে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে জাপানের কোনো প্রত্যক্ষ মালিকানা বা প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক ছিল না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটিকে ‘জাপানভিত্তিক কোম্পানি’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়। এ জন্য ব্যাংক হিসাব, বিভিন্ন নথি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থায় জমা দেওয়া কাগজপত্রে জাপানি পরিচয়ের ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

ভুয়া বিনিয়োগ ও জাল নথির অভিযোগ

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এমারল্ড অয়েলে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রকৃত বিনিয়োগের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ দেখিয়ে বিভিন্ন নথি তৈরি করা হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) তৎকালীন কিছু কর্মকর্তার সহায়তায় ভুয়া বিনিয়োগের বিপরীতে নতুন শেয়ার ইস্যুর অনুমোদন নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া অডিট প্রতিবেদনে শেয়ার মানি ডিপোজিট, দায়-দেনা এবং বিভিন্ন আর্থিক তথ্য নিয়ে অসঙ্গতির অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে। বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে শেয়ার মূলধনে রূপান্তর না করেও বছরের পর বছর তা বহাল রাখা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

কাগুজে ঋণ দেখিয়ে সম্পদ প্রদর্শনের অভিযোগ

অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, মিনোরি বাংলাদেশ বিভিন্ন অস্তিত্বহীন বা ঋণ দেওয়ার আইনগত সক্ষমতা নেই—এমন প্রতিষ্ঠান থেকে কোটি কোটি টাকার ঋণ দেখিয়ে আর্থিক সক্ষমতা প্রদর্শনের চেষ্টা করেছে। এসব ঋণের পক্ষে কোনো ঋণচুক্তি, ব্যাংক লেনদেন বা কর-সংক্রান্ত নথি পাওয়া যায়নি বলেও দাবি করা হয়েছে।

এছাড়া একটি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের মালিক নিজেই মিনোরির পরিচালক হওয়া সত্ত্বেও অডিট প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেন (রিলেটেড পার্টি ডিসক্লোজার) উল্লেখ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মাত্র ১০ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করা এবং কয়েক বছরে নগণ্য মুনাফা অর্জনকারী একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে ‘জাপানি বিনিয়োগকারী’ পরিচয়ে এত বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হলো, তা নিয়ন্ত্রক সংস্থার খতিয়ে দেখা উচিত।

তাদের দাবি, অতীতে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের কারসাজির অভিযোগ ওঠার পরও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়নি। ফলে বর্তমানে এমারল্ড অয়েলের শেয়ার নিয়ে নতুন করে কারসাজির অভিযোগ উঠায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউসেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। বিনিয়োগকারীরা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ