
দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দায়েরের জন্য প্রস্তুত করা এক অভিযোগে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) জোন-৫-এর পরিচালক মো. হামিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য, নোটিশ বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, চাকরি বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজউকের জোন-৪ (গুলশান) এলাকায় বদলি হওয়ার জন্য তিনি জোরালোভাবে লবিং করছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ধানমন্ডি এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আব্দুল করিম অভিযোগটি দুদকে জমা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিচালক হামিদুল ইসলাম অবশ্য সব ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তদন্ত হলেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।
নোটিশ দিয়ে ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ
অভিযোগে বলা হয়েছে, হামিদুল ইসলাম তাঁর অধীনস্থ ইমারত পরিদর্শকদের মাধ্যমে বিভিন্ন বাড়ির মালিককে নোটিশ দিয়ে ভয়ভীতি সৃষ্টি করতেন। পরে মোটা অঙ্কের অর্থ নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট নোটিশ গায়েব করে দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া রাজউকে চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ আদায়, মোবাইল কোর্টকে কেন্দ্র করে আর্থিক সমঝোতা এবং একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট কেনার অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে।
কর্মজীবন ও পূর্বের অভিযোগ
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, হামিদুল ইসলামের গ্রামের বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর থানার রূপসায়। তিনি দর্শন বিষয়ে এম.এ ডিগ্রিধারী।
২০০৭ সালের ৫ ডিসেম্বর সহকারী সচিব হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন তিনি। পরে ২০১৬ সালে উপ-পরিচালক এবং ২০২৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পরিচালক পদে পদোন্নতি পান। বর্তমানে তিনি রাজউকের জোন-৫-এর দায়িত্ব পালন করছেন। চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী ২০৩৬ সালের ২৪ নভেম্বর তাঁর অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে এর আগেও ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০ এপ্রিল এবং ২০ আগস্ট দুদকে একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছিল।
ড্রাইভার নিয়োগের নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ
নতুন অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, চাকরিতে যোগদানের কয়েক বছরের মধ্যেই হামিদুল ইসলামের আর্থিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ সালে রাজউকে ড্রাইভার পদে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে কেরানীগঞ্জের শাহীন ও আব্দুল্লাহপুরের মতিনসহ কয়েকজনের কাছ থেকে জনপ্রতি পাঁচ লাখ টাকা নেওয়া হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, চাকরির আশায় শাহীন তাঁর পৈতৃক জমি বিক্রি করেন। অন্যদিকে মতিন স্ত্রীর গহনা বিক্রি ও ঋণ করে অর্থ সংগ্রহ করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁদের চাকরি হয়নি এবং নেওয়া অর্থও ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
মো. মাজেদুল ইসলামের করা আগের একটি অভিযোগেও একই ধরনের তথ্য উল্লেখ ছিল বলে জানা গেছে।
এরিয়া বণ্টন ও মাসিক চাঁদার অভিযোগ
পরিচালক হিসেবে ইমারত পরিদর্শকদের এরিয়া বণ্টনের ক্ষমতা ব্যবহার করে হামিদুল ইসলাম ঘন ঘন দায়িত্বের এলাকা পরিবর্তন করতেন বলেও অভিযোগে বলা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে ইমারত পরিদর্শকদের বিভিন্ন এলাকা বণ্টন করা হতো। এরপর তাঁদের কাছ থেকে প্রতি মাসে পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, তাঁর নির্দেশে অধীনস্থ কর্মকর্তারা বিভিন্ন বাড়ির মালিককে নোটিশ দিয়ে চাপ সৃষ্টি করতেন। পরে অর্থ নেওয়ার পর সেই নোটিশ গায়েব করে দেওয়া হতো।
রাজউকের একজন অথরাইজড অফিসারের বিরুদ্ধেও একইভাবে নোটিশ গায়েব করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও দাবি করা হয়েছে।
মোবাইল কোর্টের পর আর্থিক সমঝোতার অভিযোগ
মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকে কেন্দ্র করেও একাধিক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর নিউ এলিফ্যান্ট রোডের হোল্ডিং নম্বর ১১০, ১১১ ও ১১২ নম্বর ভবনে মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়। ভবনগুলোর মালিক হিসেবে কামরুল হাসানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে ২০ লাখ টাকার লেনদেনের মাধ্যমে সেখানে পুনরায় কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
একই এলাকার হোল্ডিং নম্বর ৮২-এর একটি ভবনের ক্ষেত্রেও আবাসিক অনুমোদন নিয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়। ভবনটির মালিক হিসেবে মিসেস রহিমা সাহাবুদ্দিনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, পরে ১৫ লাখ টাকা নেওয়ার মাধ্যমে বিষয়টি চাপা দেওয়া হয়।
বিভিন্ন এলাকায় রফা করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ
মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন হাউজিং এলাকা, বসিলা, চাঁদ উদ্যান ও তেজতুড়ি বাজারসহ বিভিন্ন স্থানের ভবন মালিকদের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, অভিজ্ঞ ইমারত পরিদর্শকদের যথাযথ এলাকায় দায়িত্ব না দিয়ে নতুন এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত বলে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো।
সম্পদ অর্জন নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০১০ সালের পর থেকে হামিদুল ইসলাম রংপুরে অধিক ফসলি জমি এবং ঢাকায় একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট কিনেছেন।
শ্বশুরবাড়ির এলাকাতেও সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
রংপুরের লালপুকুর-মিঠাপুকুর এলাকার কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, এসব সম্পদের বৈধ উৎস নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁদের মতে, সম্পদগুলো তাঁর বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
তবে এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা ও অর্থের উৎস সংশ্লিষ্ট নথি এবং নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
গুলশান জোনে বদলির জন্য লবিংয়ের অভিযোগ
বর্তমানে রাজউকের জোন-৪ বা গুলশান জোনে বদলি হওয়ার জন্য হামিদুল ইসলাম মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে জোরালোভাবে লবিং চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগে বলা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের মতে, ক্ষমতা ও প্রভাব ব্যবহার করে সুবিধাজনক এলাকায় বদলির চেষ্টা করা হলে বিষয়টি তদন্তের আওতায় আনা উচিত।
রাজউক চেয়ারম্যানের বক্তব্য
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম বলেন,
“যেকোনো অভিযোগ এলে আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করে দেখি। ইতিমধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কেউ যদি দোষী প্রমাণিত হন, তাহলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জনস্বার্থে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
দুদকের বক্তব্য
দুদকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মো. শাহজাহান আলী বলেন,
“আমরা সব অভিযোগ গুরুত্বসহকারে দেখি। কোনো অভিযোগ জমা পড়লে প্রাথমিক যাচাইয়ের পর তদন্ত শুরু করা হয়। এই অভিযোগটিও যথাযথ প্রক্রিয়ায় দেখা হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট।”
টিআইবির উদ্বেগ
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন,
“রাজউকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির অভিযোগ উদ্বেগজনক। নোটিশ বাণিজ্য ও ঘুষের অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে তা নাগরিকদের জীবনযাত্রা ও নগর পরিকল্পনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দুদক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে জনআস্থা নষ্ট হয়।”
নাগরিকদের দ্রুত তদন্তের দাবি
ধানমন্ডির বাসিন্দা ও নাগরিক সমাজের সদস্য আনোয়ার হোসেন বলেন,
“রাজউকের কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েন। নোটিশ দিয়ে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগ শুনে আমরা ক্ষুব্ধ। দুদক যেন দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়।”
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ফাতেমা বেগম বলেন,
“আমাদের এলাকাতেও এ ধরনের ঘটনা শোনা যায়। পরিচালক যদি নিজেই জড়িত থাকেন, তাহলে নিচের কর্মকর্তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। জবাবদিহিতা চাই।”
গুলশানের সচেতন নাগরিক রফিকুল ইসলাম বলেন,
“জোন পরিবর্তনের লবিংয়ের অভিযোগও গুরুতর। ক্ষমতার অপব্যবহার করে পদ বদলের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। দুদক যেন নিরপেক্ষ তদন্ত করে।”
হামিদুল ইসলামের দাবি—অভিযোগগুলো পুরোনো
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের জোন-৫-এর পরিচালক মো. হামিদুল ইসলাম বলেন,
“এসব অভিযোগ পুরোনো। আমি এসব অভিযোগের বিষয়ে জানি। এর আগে দুদকে অভিযোগ করা একজন তাঁর অভিযোগ তুলে নিয়েছেন। আমি আমার দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করি। কোনো অনিয়ম করিনি। তদন্ত হলে সত্য বেরিয়ে আসবে।”

