Monday, August 31, 2026

বরিশাল গণপূর্তে লটারির কাজ হস্তান্তর ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ, পটপরিবর্তনের পরও ‘পুরোনো বলয়’ সক্রিয়

বরিশাল গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন উন্নয়ন ও মেরামতকাজে লটারিতে নির্বাচিত ঠিকাদারকে কাজ না দিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, কৌশলে পছন্দের ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়া এবং দরপত্র প্রক্রিয়ায় একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের একটি বলয় গণপূর্ত কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছে বলে অভিযোগ করেছেন সাধারণ ঠিকাদাররা।

তাদের দাবি, গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও বরিশাল গণপূর্ত কার্যালয়ে সাবেক মন্ত্রী ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ঘিরে গড়ে ওঠা পুরোনো প্রভাববলয়ের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

লটারিতে কাজ পেলেও ওয়ার্ক অর্ডার অন্যকে দেওয়ার অভিযোগ

বরিশাল জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং ‘মেসার্স মুস্তাকিম বিল্ডার্স’-এর মালিক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম মাহফুজের অভিযোগ, শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালের প্রায় ১৫ লাখ টাকার একটি কাজের লটারিতে তার প্রতিষ্ঠান নির্বাচিত হয়। ওই কাজের আইডি নম্বর ১২৫৭৬৪০।

তার দাবি, লটারিতে মুস্তাকিম বিল্ডার্স নির্বাচিত হলেও নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম প্রতিষ্ঠানটিকে ওয়ার্ক অর্ডার দেননি। বরং আগে থেকেই মনোনীত সিফাত নামের এক ব্যক্তিকে দিয়ে কাজটির কিছু অংশ করিয়ে নেওয়া হয়। সিফাত কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইনানের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরে সংশ্লিষ্ট সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ারের (এসও) সঙ্গে যোগসাজশ করে সিফাতকে কাজটি সন্তোষজনকভাবে সম্পন্ন করার সনদও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন মাহফুজ।

এ ধরনের আরেকটি ঘটনা ২০২৫ সালের মে মাসের একটি দরপত্রেও ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই দরপত্রের আইডি নম্বর ১১০৫২০৩। অভিযোগ অনুযায়ী, শেবাচিম হাসপাতালের মেরামতকাজের জন্য লটারিতে ‘জেড আর এন্টারপ্রাইজ’ নির্বাচিত হলেও প্রতিষ্ঠানটিকে কৌশলে অযোগ্য দেখিয়ে কাজটি ‘এম এস খান এন্টারপ্রাইজ’-কে দেওয়া হয়।

পাসওয়ার্ড নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ

সাধারণ ঠিকাদার রিপন, কয়েস এবং সরকারি বরিশাল কলেজের সাবেক ভিপি শাহীন অভিযোগ করেন, সম্প্রতি পাঁচটি মডেল মসজিদ, নভোথিয়েটার, দুদক ভবন, আনসার অফিস, উজিরপুর থানা ভবন ও বিটেকসহ বড় অঙ্কের বেশ কয়েকটি কাজ একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

তাদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার (এসও) জাকারিয়ার ভূমিকা রয়েছে। নির্বাহী প্রকৌশলীর দরপত্র-সংক্রান্ত পাসওয়ার্ডও তার কাছে থাকে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি ঠিকাদারি লাইসেন্স নিয়ন্ত্রণ, যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়াই এস্টিমেট প্রস্তুত এবং দরপত্রের রেট কোড মিলিয়ে দেওয়ার মতো কাজেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

ঠিকাদারদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ঝালকাঠিতে প্রভাব বিস্তার করা এই প্রকৌশলী বর্তমানে বরিশালে এসে ‘কাশি মিজান’, ঝালকাঠির খান্ড বিল্ডার্সের নাসির খান এবং বরিশালের ‘ছোট মাহফুজ’-এর মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণ করছেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়, মিজান ওরফে ‘কাশি মিজান’ বিতর্কিত ঠিকাদার জিকে শামীমের লোক হিসেবে পরিচিত এবং তার কাছে অন্তত ছয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের পাসওয়ার্ড রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

হত্যা মামলার আসামি প্রকৌশলী, বহাল রয়েছেন পদে

এদিকে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর পরোক্ষ হামলার অভিযোগে দায়ের করা একটি হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলমকে। তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া এবং গণপূর্ত কার্যালয়কে দলীয় কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।

সম্প্রতি মুজিব কোট ও নৌকার ব্যাজ পরা অবস্থায় তার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

মামলার বাদী জুলাই যোদ্ধা মো. জহিরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, মামলার আসামিরা প্রকাশ্যে চলাফেরা করলেও তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না।

তবে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল মামুন উল ইসলাম বলেন, মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলছে। ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং তাদের সংশ্লিষ্টতা কী পর্যায়ের, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কিছু স্থানীয় নেতার ছত্রচ্ছায়া এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রভাব কাজে লাগিয়ে ফয়সাল আলম স্বপদে বহাল রয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ অস্বীকার প্রকৌশলীর

অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। মুজিব কোট পরা ছবির বিষয়ে তিনি বলেন, ছবিগুলো সম্পাদনা করা হয়েছে।

দরপত্রের রেট কোডের গোপনীয়তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো একটি দপ্তর থেকে তথ্য ফাঁস হওয়া অসম্ভব নয়। তবে তিনি নিজে এ ধরনের তথ্য কাউকে দেননি বলে দাবি করেন।

এসও জাকারিয়া অভিযোগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। নির্বাহী প্রকৌশলীর অনুমতি ছাড়া তার কথা বলার নিয়ম নেই বলে জানান তিনি।

সিন্ডিকেটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন খান বিল্ডার্সের নাসির খানও। তার দাবি, তারা সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে এবং পূর্বের কাজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই বিভিন্ন কাজ পেয়ে থাকেন।

তদন্তের আশ্বাস সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের

বরিশাল সদর আসনের সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, আওয়ামী লীগের লোকজন এখনো বিভিন্ন দপ্তরে থেকে তাবেদারি করছে, বিষয়টি দুঃখজনক। অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসকও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, গত ১৭ বছর বিরোধী মতের ঠিকাদাররা কাজের সুযোগ না পাওয়ায় অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেননি। তাই পুরো ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

গোপালগঞ্জের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও বরিশাল জোনের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মোক্তার দেওয়ান বলেন, ফোনে অভিযোগের বিষয়টি পুরোপুরি যাচাই করা কঠিন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তিনি বরিশাল কার্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বরিশাল গণপূর্ত কার্যালয়ে লটারিতে নির্বাচিত ঠিকাদারকে কাজ না দেওয়া, দরপত্র প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রভাব এবং প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের একটি বলয়ের আধিপত্যের যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর প্রকৃত চিত্র নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, দরপত্র প্রক্রিয়া এবং অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনিক তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ