Monday, August 31, 2026

কাস্টমস কর্মকর্তা তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার সম্পদ ও নানা অনিয়মের অভিযোগ

কাস্টমস কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন, সরকারি ক্ষমতার প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতি, ‘তাজ ব্রিকস’ ইটভাটায় নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ড এবং ফুলবাড়ীয়া কলেজের অর্থ ব্যবস্থাপনা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয় পর্যায়ে পাওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে জানা গেছে, সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসা, প্রতিষ্ঠান ও সম্পদের মাধ্যমে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ যাচাই এখনো প্রয়োজন।

অভিযোগকারীদের দাবি, ড. তাজুল ইসলাম এবং তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ তাঁর বৈধ আয় ও চাকরিজীবন থেকে অর্জিত আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফুলবাড়ীয়া ও আশপাশের এলাকায় জমি, বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ধরনের সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়ের অর্থের উৎস এবং ঘোষিত আয়-ব্যয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—তা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

‘তাজ ব্রিকস’ ঘিরে নানা প্রশ্ন

ড. তাজুল ইসলামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘তাজ ব্রিকস’ ইটভাটাকে ঘিরেও একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, ইটভাটার পরিচালনা, জমি ব্যবহার, পরিবেশগত অনুমোদন, কাঁচামাল সংগ্রহ এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।

ইটভাটার নামে ব্যবহৃত জমির মালিকানা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন, পরিবেশ ছাড়পত্র এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের অনুমতিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে ড. তাজুল ইসলাম বিভিন্ন সময়ে নিজের প্রভাব ব্যবহার করে ব্যবসায়িক স্বার্থ সংরক্ষণ করেছেন। তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন, জমি ক্রয় এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে তাঁর নিজস্ব আয়, পরিবারের সদস্যদের আয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থের মধ্যে কোনো অসামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি উঠেছে।

ফুলবাড়ীয়া কলেজের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ

ফুলবাড়ীয়া কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি থাকাকালীন ড. তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটির অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, কলেজের ভর্তি কার্যক্রম, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, বার্ষিক বনভোজন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এসব ব্যয়ের ক্ষেত্রে যথাযথ অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না, ব্যয়ের বিপরীতে প্রয়োজনীয় বিল-ভাউচার ছিল কি না এবং আর্থিক বিধিবিধান অনুসরণ করা হয়েছে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কলেজের সাধারণ তহবিলের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও প্রচার কার্যক্রমের নামে অর্থ ব্যয় এবং বিজ্ঞাপন বাবদ অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়েছিল কি না, তা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, কলেজের হিসাববই, ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, বিল-ভাউচার এবং গভর্নিং বডির সভার কার্যবিবরণী পর্যালোচনা করলে এসব অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

নিয়োগে কয়েক কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ

ফুলবাড়ীয়া কলেজের শিক্ষক, ল্যাব সহকারী ও কর্মচারী নিয়োগকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, কথিত নিয়োগ বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৫ থেকে ৮ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তবে এই অর্থ লেনদেনের অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।

ফলে নিয়োগপ্রাপ্ত ও নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থীদের বক্তব্য, নিয়োগসংক্রান্ত নথি, ব্যাংক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক তথ্য পর্যালোচনার মাধ্যমে অভিযোগটি যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চাকরির আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন

ড. তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাঁর চাকরিজীবনের আয় ও কথিত সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না।

অভিযোগকারীদের মতে, সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর বেতন-ভাতা, পারিবারিক আয় এবং অন্যান্য বৈধ আয়ের উৎসের সঙ্গে বর্তমানে তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের তুলনা করলে সম্পদ অর্জনের প্রকৃত উৎস সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

বিশেষ করে জমি ক্রয়, বাড়ি নির্মাণ, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ, ব্যাংক হিসাব ও অন্যান্য আর্থিক সম্পদের তথ্য যাচাই করার দাবি উঠেছে।

শুধু তাঁর নিজের নামে থাকা সম্পদ নয়, পরিবারের সদস্য, ঘনিষ্ঠজন বা অন্য কোনো ব্যক্তির নামে সম্পদ রেখে প্রকৃত মালিকানা আড়াল করা হয়েছে কি না—সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

এ ক্ষেত্রে জমির দলিল, নামজারি, খতিয়ান, ভূমি উন্নয়ন করের তথ্য, ব্যাংক হিসাব, আয়কর রিটার্ন এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির মালিকানা-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ ও অর্থের উৎস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

কলেজ ও ইটভাটার কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পদের যোগসূত্রের প্রশ্ন

‘তাজ ব্রিকস’ এবং ফুলবাড়ীয়া কলেজকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের সঙ্গে ড. তাজুল ইসলাম ও তাঁর পরিবারের সম্পদ বৃদ্ধির কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

বিশেষ করে কলেজের অর্থ ব্যবস্থাপনা, নিয়োগ কার্যক্রম ও অন্যান্য খাতে কথিত অনিয়মের মাধ্যমে কোনো অর্থ আত্মসাৎ বা অবৈধভাবে অর্জন করা হয়ে থাকলে সেই অর্থের কোনো অংশ পরবর্তীতে জমি, বাড়ি, ব্যবসা বা অন্যান্য সম্পদ অর্জনে ব্যবহৃত হয়েছে কি না—তা নির্ধারণে আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন প্রভাবশালী অবস্থানে থাকার কারণে ড. তাজুল ইসলামকে ঘিরে ওঠা এসব বিষয়ে কার্যকর অনুসন্ধান হয়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পুরোনো অভিযোগগুলো আবার সামনে আসায় তাঁর সম্পদ, ব্যবসা ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে।

অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ড. তাজুল ইসলামের আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, জমি ও ভবনের দলিল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকানা এবং আর্থিক লেনদেন পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা।

একই সঙ্গে ‘তাজ ব্রিকস’-এর অনুমোদন, পরিবেশ ছাড়পত্র, জমি-সংক্রান্ত নথি ও আর্থিক হিসাব এবং ফুলবাড়ীয়া কলেজের আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।

নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অর্থ লেনদেনের অভিযোগের ক্ষেত্রে নিয়োগপ্রাপ্ত ও বঞ্চিত প্রার্থীদের বক্তব্য, নিয়োগসংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক লেনদেনও যাচাই করা প্রয়োজন।

সবশেষে, ড. তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা নথিপত্র, আর্থিক হিসাব ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারণ করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ