
পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশনের (পিডিবিএফ) কর্মকর্তা মামুনুর রশিদকে ঘিরে চাকরিতে নিয়োগ থেকে শুরু করে পদোন্নতি, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় একাধিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট নথি, নিরীক্ষা আপত্তি, তদন্ত-সংক্রান্ত দাবি এবং বিভিন্ন পর্যায়ের অভিযোগ পর্যালোচনায় তাঁর দায়িত্ব পালন ও প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, মামুনুর রশিদের চাকরিতে প্রবেশের সময়ই নির্ধারিত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট পদে আবেদনের সময় তাঁর বয়স ছিল ৩১ বছর ২৪ দিন। অথচ ওই নিয়োগে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩০ বছর নির্ধারিত ছিল। একই সঙ্গে আবেদনপত্রে অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করা হলেও সেই অভিজ্ঞতার পক্ষে প্রয়োজনীয় সনদ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র জমা দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ অবস্থায় নির্ধারিত বয়সসীমা অতিক্রম করার পর কীভাবে তাঁর আবেদন গ্রহণ করা হলো এবং কোন বিধি বা সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তাঁকে নিয়োগের জন্য যোগ্য বিবেচনা করা হয়েছিল—তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
বাগেরহাট কার্যালয়ে ৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুতর হলো বাগেরহাট সদর কার্যালয়ে ৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ।
অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি পিরোজপুর অঞ্চলে সহকারী পরিচালক (মনিটরিং) হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় বাগেরহাট সদর কার্যালয়ে ওই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। অভিযোগকারীদের দাবি, পিডিবিএফের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।
যদি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়ের বিষয়ে তথ্য উল্লেখ থেকে থাকে, তাহলে অর্থের উৎস, কীভাবে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে, কার কী ধরনের ভূমিকা ছিল এবং পরবর্তীতে অর্থ উদ্ধারে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল—এসব বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযুক্ত হয়েও তদন্ত কমিটিতে থাকার অভিযোগ
বাগেরহাটের অর্থ আত্মসাতের ঘটনাকে ঘিরে তদন্ত কমিটির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে ওই ঘটনায় অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাঁকে তদন্ত কমিটির সদস্য করা হয়েছিল।
অর্থাৎ যে ঘটনায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে, সেই ঘটনার তদন্ত প্রক্রিয়াতেই তিনি অংশ নিয়েছেন—এমন দাবি সত্য হলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের প্রশাসনিক আদেশ, সদস্যদের দায়িত্ব, তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ এবং পরবর্তী সময়ে নেওয়া পদক্ষেপের নথি প্রকাশ করা হলে প্রকৃত বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বাগেরহাটের ওই ঘটনায় পাঁচজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতিসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হলেও মামুনুর রশিদ চাকরিতে বহাল ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ধারাবাহিকভাবে পদোন্নতিও পেয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
একই ঘটনায় কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এবং তদন্ত প্রতিবেদনে তাঁর দায় কতটুকু নির্ধারণ করা হয়েছিল—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
পদোন্নতিতে মূল্যায়ন নম্বর পরিবর্তনের অভিযোগ
মামুনুর রশিদের পদোন্নতি নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর বার্ষিক কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের নম্বর পরিবর্তন বা ঘষামাজার মাধ্যমে বাড়ানো হয়েছিল। পাশাপাশি তৎকালীন রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগসাজশ করে পদোন্নতি নিশ্চিত করার অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ বিষয়টি তদন্ত করে পদোন্নতি বাতিল এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিল।
এ ছাড়া পিডিবিএফের তৎকালীন অতিরিক্ত পরিচালক (মানবসম্পদ উন্নয়ন) মহিউদ্দিন আহমেদ পান্নু পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত বক্তব্য দিয়েছিলেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
এ ধরনের লিখিত বক্তব্য দেওয়া হয়ে থাকলে সেটির মূল কপি, তদন্তের ফলাফল এবং সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়েছিল কি না—এসব নথি যাচাই করলেই পদোন্নতি নিয়ে ওঠা অভিযোগের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
প্রকল্প বাস্তবায়নেও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ
পিডিবিএফের ‘কার্যক্রম সম্প্রসারণ প্রকল্প ২য় পর্যায়’ নিয়েও মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি ওই প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রকল্পের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। তবে অভিযোগের আর্থিক পরিমাণ, আত্মসাতের পদ্ধতি এবং এ বিষয়ে তদন্ত বা নিরীক্ষায় কী ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে—তা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নথি ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনা প্রয়োজন।
নিয়োগ কমিটিতে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়াতেও মামুনুর রশিদের প্রভাব নিয়ে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, তিনি সংশ্লিষ্ট নিয়োগ ও পদোন্নতি কমিটির সদস্য না হয়েও প্রভাব খাটিয়ে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হন এবং বিতর্কিত বা অযোগ্য ব্যক্তিদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন।
তাঁর প্রভাবাধীন সময়ে ১ হাজার ৬৬৫ জনকে নিয়োগ দেওয়ার পাশাপাশি আরও ২ হাজার ২০০ জনকে নিয়ে একটি বড় অপেক্ষমাণ তালিকা তৈরি করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে মাঠপর্যায়ে তাঁর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মাধ্যমে নিয়োগপ্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আর্থিক দর-কষাকষির অভিযোগও করা হয়েছে।
১ হাজার ৬৬৫ নিয়োগে ২২ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রশ্ন
ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ার আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ১ হাজার ৬৬৫ জনকে নিয়োগ দিতে প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছিল।
এই ব্যয়ের যৌক্তিকতা, অর্থ কোন কোন খাতে ব্যয় করা হয়েছে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষা, মূল্যায়ন, প্রশাসনিক ব্যয়সহ অন্যান্য খাতে কত টাকা বরাদ্দ ও ব্যয় হয়েছে—এসব তথ্য নিরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হলে অভিযোগের আর্থিক ভিত্তি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
ফজিলাতুন্নেসার নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন
পিডিবিএফের প্রশাসন শাখার উপপরিচালক ফজিলাতুন্নেসাকে ঘিরেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে আপত্তি ওঠার পর বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তর তাঁর নিয়োগ বাতিল, অর্থ আদায় এবং চাকরিচ্যুতির সুপারিশ করেছিল।
একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিয়োগদাতাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষা আপত্তি নিয়ে আলোচনা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব আপত্তি ও সুপারিশের পরও ফজিলাতুন্নেসা কীভাবে চাকরিতে বহাল থাকলেন এবং পরবর্তীতে উপপরিচালক পদে পদোন্নতি পেলেন—তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
তাঁদের দাবি, মামুনুর রশিদের প্রভাবেই তাঁর পদোন্নতি হয়েছে। এমনকি উৎকোচের বিনিময়ে পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
তদন্ত ও নথি যাচাইয়ের দাবি
মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো একত্রে বিবেচনা করলে তাঁর চাকরিতে প্রবেশের যোগ্যতা, আর্থিক অনিয়ম, তদন্ত প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত, পদোন্নতিতে অনিয়ম, প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের মতো একাধিক বিষয় সামনে আসে।
এখন মূল প্রশ্ন হলো, এসব অভিযোগের কোনোটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আগে তদন্ত করে থাকলে সেই তদন্তের ফলাফল কী হয়েছিল এবং সুপারিশ অনুযায়ী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
একইভাবে পিডিবিএফের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদন, মন্ত্রণালয়ের তদন্ত, সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—এই নথিগুলো পাশাপাশি পর্যালোচনা করা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত ভিত্তি নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে।
এদিকে, পিডিবিএফের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ মামুনুর রশিদ ও ফজিলাতুন্নেসার বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

