বৃহস্পতিবার, জুলাই ৩০, ২০২৬

আমিনবাজার ভূমি অফিসের কর্মকর্তা মনিরুজ্জামানের বি’রুদ্ধে অ’নিয়ম, ঘু’ষ ও রা’জনৈতিক সম্পৃক্ততার অ’ভিযোগ

ঢাকার সাভারের আমিনবাজার ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, দালালচক্রের মাধ্যমে ভূমিসেবা নিয়ন্ত্রণ, নামজারিতে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং সরকারি চাকরিতে থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে সম্প্রতি স্থানীয় চার বাসিন্দা ঢাকা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে লিখিত আবেদন করেছেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মনিরুজ্জামান দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বিভিন্ন কর্মসূচি, জনসভা ও সমাবেশে তাকে নিয়মিত দেখা যেত। সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের সঙ্গে তার তোলা একাধিক ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় পোস্টার আকারেও প্রকাশ করা হয়। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি নিজেকে বিএনপির সমর্থক হিসেবে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমানে মনিরুজ্জামান আমিনবাজার ইউনিয়ন ভূমি অফিসে নায়েব হিসেবে কর্মরত। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশ ভূমি অফিসার্স কল্যাণ সমিতির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ঢাকা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ঢাকার ডেমরা এলাকার বাসিন্দা। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি বদলি হয়ে আমিনবাজার ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যোগদান করেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ভূমি অফিসার্স কল্যাণ সমিতির নেতা হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে তিনি রাজধানী ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছেন।

অভিযোগ রয়েছে, আমিনবাজারে যোগদানের পর থেকেই তিনি ঘুষ গ্রহণ, দালালচক্রের মাধ্যমে ভূমিসেবা নিয়ন্ত্রণ, জমি-সংক্রান্ত অনিয়ম এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে সাধারণ মানুষের জমি দখলে সহায়তা করছেন। একই সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরকারি চাকরিতে থেকেও তিনি অতীতে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন। বিশেষ করে ঢাকা-৫ আসনের সাবেক আওয়ামী লীগ প্রার্থী কাজী মনিরুল ইসলাম মনুর নির্বাচনী প্রচারণায় তাকে ডেমরা, ধীৎপুর ও খলাপাড়া এলাকায় সক্রিয়ভাবে দেখা গেছে। এছাড়া সাবেক ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের ঘনিষ্ঠজন হিসেবেও তিনি পরিচিত ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।

একাধিক ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মনিরুজ্জামান নিজেকে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন সময় প্রভাব বিস্তার করতেন। কেউ তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে হয়রানি করা হতো বলেও অভিযোগ করেন তারা। তাদের দাবি, অফিস চলাকালেও জনসেবার চেয়ে রাজনৈতিক তদবির ও ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারেই তিনি বেশি মনোযোগী ছিলেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও মনিরুজ্জামানের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং তিনি বর্তমানে আমিনবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালন করছেন এবং আগের মতোই প্রভাব বিস্তার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ডিসির কাছে লিখিত অভিযোগ

গত মাসে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে বলা হয়, আমিনবাজার রাজস্ব সার্কেল ভূমি অফিসে একটি সংঘবদ্ধ দালালচক্রের মাধ্যমে বিভিন্ন ভূমিসেবা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। নামজারি, খতিয়ানসহ বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়।

অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, অফিসে নিয়মবহির্ভূত সময় পর্যন্ত কার্যক্রম পরিচালনা, দালালদের অবাধ উপস্থিতি এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক অনিয়মের কারণে সাধারণ সেবাগ্রহীতারা প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অভিযোগকারীরা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার, বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

সরকারি কর্মকর্তা হয়েও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত বিভিন্ন ছবি, ভিডিও এবং স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তা থাকা অবস্থায় মনিরুজ্জামান ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকার পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া আওয়ামী লীগের একজন দাতা হিসেবেও তার নাম রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, একজন সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন এবং এতদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের দাবি, এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

সম্প্রতি ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মনিরুজ্জামানকে নিয়ে পোস্টার সাঁটানো হয়। পোস্টারগুলোতে তাকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ এবং ‘ঢাকা জেলা ভূমি অফিসের অঘোষিত মাফিয়া’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সেখানে সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, সাবেক সংসদ সদস্য কাজী মনোয়ারুল ইসলাম (মনু), সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান মোল্লাসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতার সঙ্গে তার তোলা ছবি প্রকাশ করা হয়। পাশাপাশি নৌকার পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা, নিজ অর্থায়নে নির্বাচনী ক্যাম্প পরিচালনা এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে তোলা ছবিও পোস্টারে স্থান পায়। পোস্টার প্রকাশকারীদের দাবি, এসব ছবি তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রমাণ বহন করে।

যা বললেন মনিরুজ্জামান

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মনিরুজ্জামান বলেন, তার বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র চলছে। তিনি লিখিত অভিযোগের বিষয়েও অবগত নন বলে দাবি করেন।

আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে তোলা ছবি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রথমে সেগুলো নিজের নয় বলে দাবি করেন। পরে তিনি বলেন, “ছবিগুলো আমার মতো দেখা যাচ্ছে। তবে এগুলো কবে তোলা হয়েছে বা কেউ সম্পাদনা করেছে কি না, তা আমি নিশ্চিত নই। অনেক পুরোনো বিষয় নিয়ে আমাকে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।”

বিএনপি নেতাদের প্রতিক্রিয়া

সাভারের বনগাঁও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি হাজী আবু সাঈদ বলেন, বিষয়টি তার জানা ছিল না। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দলের ঊর্ধ্বতন নেতাদের জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাবেন।

সাভার থানা বিএনপির সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “এ ধরনের অভিযোগ আগে আমার জানা ছিল না। যদি অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়, তাহলে এমন ব্যক্তির ওই পদে থাকার সুযোগ নেই।”

প্রশাসনের বক্তব্য

সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, অভিযোগের বিষয়টি তিনি আগে জানতেন না। তিনি জানান, অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করে সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ