Sunday, August 30, 2026

মা’ম’লাভুক্ত জমিতে ঘু’ষে’র বিনিময়ে ক্ষতিপূরণের চেক দেওয়ার অভিযোগ, ১৭ মাসেও হয়নি তদন্ত

রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার সাবেক সার্ভেয়ার আজাদ রহমান, কানুনগো সাইফুল ইসলাম ও অফিস সহকারী মিলন মিয়ার বিরুদ্ধে মামলাভুক্ত জমির তথ্য গোপন করে ঘুষের বিনিময়ে ক্ষতিপূরণের চেক দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা উৎকোচ নিয়ে আইনি জটিলতায় থাকা জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে অভিযোগ দায়েরের পর ১৭ মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্ত শুরু না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

গত বছরের ৯ মার্চ পীরগঞ্জ, মিঠাপুকুর ও রংপুর সদর উপজেলার ছয়জন ভূমিমালিক রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগটি তদন্ত করে ২০ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য রংপুর জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নির্ধারিত সময় তো দূরের কথা, ১৭ মাসেও তদন্তের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

ভুক্তভোগী জলিল মিয়াসহ পাঁচজনের অভিযোগ অনুযায়ী, রংপুর-ঢাকা মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার ‘সাসেক-২’ প্রকল্পের আওতায় মহাসড়কের দুই পাশে বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করা হয়। পীরগঞ্জ, মিঠাপুকুর ও রংপুর সদর উপজেলার অনেক জমি নিয়ে জেলা জজ আদালত ও উচ্চ আদালতে মামলা ও আইনি বিরোধ চলমান রয়েছে।

অভিযোগকারীরা বলছেন, প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী ২০১৯ সালের পরিপত্রের ৪ নম্বর ধারায় মামলাধীন জমির ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। ৮ ধারার নোটিশ জারির পর অধিগ্রহণ করা কোনো জমি নিয়ে মামলা বা আইনি বিরোধ থাকলে সেই জমির ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু অভিযোগে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেট ওই বিধান উপেক্ষা করে ঘুষের বিনিময়ে মামলাধীন জমির ক্ষতিপূরণের চেক দিয়েছে।

অভিযোগপত্রে পীরগঞ্জের এলএ কেস নং ৩১/২০-২১-এর অধীনে ওসমানপুর মৌজার আটটি মামলাধীন জমির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে দাগ নম্বর ২১৫-এর ক্ষেত্রে মামলা নম্বর ৩২/২২ ও ২৩৭/২১; দাগ নম্বর ২২০-এর ক্ষেত্রে ল্যান্ড সার্ভে মামলা নং ১২৩৫/২২, অন্য মামলা নং ১৯/২০, সিআর ৮/১১ ও ল্যান্ড সার্ভে মামলা নং ৪৯৯/২২; দাগ নম্বর ২২১-এর ক্ষেত্রে মামলা নং ১৪০৩/২০২০; দাগ নম্বর ৩৩৬-এর ক্ষেত্রে অন্য মামলা নং ৩১/২০২২; দাগ নম্বর ৮৯১-এর ক্ষেত্রে ল্যান্ড সার্ভে মামলা নং ২৯৩/২২, ১৪৮০/২১ ও রিট পিটিশন নং ১২৭৫০; দাগ নম্বর ৯৯২-এর ক্ষেত্রে অন্য মামলা নং ২১/২২ ও আপত্তি; দাগ নম্বর ৯০০-এর ক্ষেত্রে অন্য মামলা নং ৬৭/২০০৬ ও অন্য আপিল নং ১৮০/২২ এবং দাগ নম্বর ৪০১-এর ক্ষেত্রে হাইকোর্টে ৪৯৬৮/২০০৪ নম্বর মামলা চলমান থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব মামলা ও আদালতের নথি থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র ও নথিতে পরিবর্তন এনে অর্থের বিনিময়ে ক্ষতিপূরণের টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

এ ছাড়া আরও কয়েকটি এলএ কেসের জমি নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ করা হয়েছে। এলএ কেস নং ২৫/২০-২১-এর আওতায় মোট ১৮টি মামলা থাকার কথা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে মিঠাপুকুরের শঠিবাড়ী-হরিপুর এলাকার আটটি মামলা রংপুর জজ আদালতে চলমান বলে দাবি করা হয়েছে। এসব জমির দাগ নম্বর হলো ২৫, ১৫২৮, ১৬৯৮, ১৭০০, ১৭১৯, ৪১১/৫১৬, ৪১৮ ও ৪১৯।

এলএ কেস নং ১৯/২০-২১-এর ক্ষেত্রেও একাধিক মামলার তথ্য অভিযোগে দেওয়া হয়েছে। রংপুর সদর উপজেলার তাজহাট মৌজার দাগ নম্বর ৮০৭, ৯০৮, ৭৬৮ ও ৭৬৯ নিয়ে মামলা থাকার কথা বলা হয়েছে। একই এলএ কেসের আওতায় ইসলামপুর মৌজার ৬৭৫, ৬৭৮ ও ৬৮৭ নম্বর দাগ এবং তালুক ধর্মদাস মৌজার ৭৯৭৬, ৭৯৭২ ও সাবেক ৫৮০৩ নম্বর দাগের জমিও মামলাধীন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব দাগ ও মামলাভুক্ত জমির ক্ষতিপূরণের চেকও সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিকার চেয়ে ২০২৫ সালের ৯ মার্চ বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে অভিযোগ করেন তারা।

অভিযোগটি রংপুর বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের রাজস্ব শাখায় জমা হওয়ার পর সহকারী কমিশনার সাদরুল আলম স্বাক্ষরিত স্মারক নং-০৫.৪৭.০০০০.০০৮.০৫.০১.২৩-এর মাধ্যমে রংপুর জেলা প্রশাসককে বিষয়টি তদন্ত করে ২০ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু অভিযোগকারীদের দাবি, ওই নির্দেশের পর ১৭ মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্ত সম্পন্ন হয়নি।

ভুক্তভোগী জলিল মিয়া বলেন, ‘সার্ভেয়ার আজাদ রহমান টাকা হলেই সব করেন। তিনি সহ ওই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেও সেটি ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। আমরা দ্রুত তদন্ত চাই।’

এদিকে অভিযোগের অন্যতম ব্যক্তি সাবেক সার্ভেয়ার আজাদ রহমানের বর্তমান পদায়ন নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। প্রায় সাড়ে তিন মাস আগে তিনি সার্ভেয়ার থেকে কানুনগো পদে পদোন্নতি পেয়ে দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ শাখায় বদলি হন। পরে তদবিরের মাধ্যমে আবার রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ শাখায় বদলি হয়ে গত ২৫ আগস্ট যোগদান করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, আজাদ রহমানকে রংপুরে ফিরিয়ে আনতে মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে সেখানে কর্মরত একজন কানুনগোকে সরিয়ে তার বদলির আদেশ করানো হয়। দুটি বদলি আদেশই রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের সিনিয়র সহকারী কমিশনার উত্তম কুমার দাশ করেছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

এ বিষয়ে নবাগত রংপুর জেলা প্রশাসক মিজ ইসরাত জাহান বলেন, ‘সদ্য যোগদান করেছি। এ বিষয়ে আমার জানা নেই।’

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ