Monday, August 31, 2026

পাঁচ বছরেও স্থায়ী জনবল নেই কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে, উপাচার্যের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ

প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে উঠেনি কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্থায়ী শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী ছাড়াই চুক্তিভিত্তিক ও খণ্ডকালীন জনবল দিয়ে চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। এর মধ্যেই উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ রাশেদুল ইসলামের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের একাধিক অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, স্থায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে না নিয়ে উপাচার্য তাঁর পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠদের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে চুক্তিভিত্তিক বা সাময়িকভাবে নিয়োগ দিয়েছেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি শিক্ষা কার্যক্রমের স্থায়িত্ব নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

স্থায়ী শিক্ষক ছাড়াই চলছে পাঠদান

২০২১ সালে জাতীয় সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে কৃষি ও ফিশারিজ—এই দুটি অনুষদের শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে। তবে এখনো কোনো স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ হয়নি বলে জানা গেছে।

চুক্তিভিত্তিক ও খণ্ডকালীন শিক্ষকদের ওপর নির্ভর করেই দুই অনুষদের পাঠদান পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্থায়ী নিয়োগের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ৪০টি পদ অনুমোদন করলেও গত দুই বছরে এসব পদে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, উপাচার্যের স্বজনদের বিভিন্ন পদে নিয়োগের সুযোগ তৈরি করতেই স্থায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়া বিলম্বিত করা হয়েছে। এরই মধ্যে তাঁর পরিবারের অন্তত ১০ সদস্য বিভিন্ন পদে সাময়িকভাবে নিয়োগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

গুরুত্বপূর্ণ পদে উপাচার্যের স্বজনদের নিয়োগ

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপাচার্যের আপন বোনের ছেলে আতিকুর রহমানকে পিএস টু ভিসি (সেকশন অফিসার), আপন শ্যালক আব্দুল্লাহ সোহাগকে সেকশন অফিসার (সিকিউরিটি ও পরিকল্পনা), আপন বোনের মেয়ে রেজবিন আক্তারকে কম্পিউটার টাইপিস্ট এবং ভাগনে মোস্তফা সরকারকে সেকশন অফিসার (পরীক্ষা বিভাগ) পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, পিএস আতিকুর রহমান এবং সহকারী স্টোর কিপার পদে নিয়োগ পাওয়া রেজবিন বেগমের ক্ষেত্রে চাকরিতে প্রবেশের নির্ধারিত বয়সসীমা আগেই অতিক্রম করেছিল।

এ ছাড়া ফিশারিজ অনুষদে মাস্টার্স সম্পন্ন করার আগেই মো. আহসানুল হক ও মরিয়ম আক্তারকে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এ ধরনের নিয়োগ ইউজিসির সংশ্লিষ্ট নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

প্রশাসন ও টেন্ডারে স্বজনদের প্রভাবের অভিযোগ

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন নথি পর্যালোচনায় প্রশাসনিক কার্যক্রমে উপাচার্যের স্বজনদের প্রভাবের অভিযোগও সামনে এসেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, উপাচার্যের শ্যালক আব্দুল্লাহ সোহাগ এবং ভাগনে আতিকুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও টেন্ডার কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। বিভিন্ন টেন্ডার-সংক্রান্ত নথিতে আব্দুল্লাহ সোহাগের স্বাক্ষর পাওয়া গেছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক অভিযোগ করে বলেন, যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়ে উপাচার্যের যথেষ্ট আগ্রহ নেই। স্থায়ী ও খণ্ডকালীন বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন বা ঘুষের একটি নির্দিষ্ট হার নির্ধারিত থাকার অভিযোগও রয়েছে।

তবে এসব আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ক্যাম্পাসে না থেকে ঢাকায় বসেই পরিচালনার অভিযোগ

আইন অনুযায়ী উপাচার্যের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সার্বক্ষণিক অবস্থানের কথা থাকলেও অধ্যাপক মুহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম অধিকাংশ সময় ঢাকায় অবস্থান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, ঢাকার একটি গেস্ট হাউসকে কার্যত কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করে সেখান থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। উপাচার্যের নিয়মিত ক্যাম্পাসে না থাকার কারণে প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বিশেষ করে স্থায়ী শিক্ষকের সংকটের সঙ্গে উপাচার্যের অনুপস্থিতি যুক্ত হওয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।

আগের কর্মস্থলেও অভিযোগ ছিল উপাচার্যের বিরুদ্ধে

কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের আগে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক ছিলেন অধ্যাপক রাশেদুল ইসলাম। সেখানেও তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ ওঠার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষা ছুটিতে গিয়ে তিনি প্রায় ১ বছর ১১ মাস ১৫ দিন অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত ছিলেন। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না করেই পরবর্তীতে তাঁর পদোন্নতি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া নিজের প্রভাব ব্যবহার করে স্ত্রী হোসনে আরা হীরাকে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক পদে অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

‘যোগ্যতার ভিত্তিতে সাময়িক নিয়োগ’

স্বজনপ্রীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপাচার্যের ভাগনে আতিকুর রহমান। তিনি বলেন, প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে উপাচার্য তাঁর পরিচিত ও কাছের মানুষদের দিয়ে কাজ করাচ্ছেন। তবে পুরোনো কর্মীরা বিষয়টি মেনে নিতে পারছেন না।

সার্বিক অভিযোগের বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম বলেন, তাঁর কোনো নিকটাত্মীয়কে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বর্তমানে যারা কাজ করছেন, তারা যোগ্যতার ভিত্তিতে সাময়িকভাবে নিয়োগ পেয়েছেন এবং শিক্ষা কার্যক্রম যথাযথভাবে পরিচালনা করছেন।

স্থায়ী নিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, খুব শিগগিরই পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে স্থায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।

ক্যাম্পাসে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগের বিষয়ে উপাচার্যের বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়টি নতুন হওয়ায় সরকারি ও ইউজিসির বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজের জন্য তাঁকে ঢাকায় থাকতে হয়। তবে ছুটির দিনেও তিনি ক্যাম্পাসে এসে রাত পর্যন্ত কাজ করেন বলে দাবি করেন।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

কুড়িগ্রাম জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক লিয়াকত আলী বলেন, সম্ভাবনাময় একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুতেই স্বজনপ্রীতি, নিয়মবহির্ভূত নিয়োগ ও প্রশাসনিক অনিয়মের মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠা উদ্বেগজনক।

তিনি বলেন, শিক্ষার পরিবেশ তৈরির পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানটি যদি অনিয়মের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, তাহলে তা কুড়িগ্রামের মানুষের প্রত্যাশার জন্য বড় আঘাত। স্থায়ী শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগ না দিয়ে পছন্দের ব্যক্তিদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক পরিবেশে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সরেজমিন তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছর পরও স্থায়ী জনবল কাঠামো পূরণ না হওয়া, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের প্রভাবের অভিযোগ—সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এসব অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নিয়োগ, নথিপত্র ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ