বৃহস্পতিবার, জুলাই ৩০, ২০২৬

একরামুল হ’ত্যা মা’ম’লা’য় অ’ভিযোগপত্র, নতুন করে আলোচনায় র‍্যাব-৭-এর তৎকালীন ‘ক্র’স’ফা’য়া’র’

টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগপত্র দাখিলের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে র‍্যাব-৭-এর তৎকালীন অভিযানে সংঘটিত একাধিক কথিত ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনা। মামলায় তৎকালীন র‍্যাব-৭ অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদকে সেনা হেফাজতে নেওয়ার পর ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে তাঁর দায়িত্বকালীন বিভিন্ন অভিযানের ঘটনাও নতুন করে পর্যালোচনার দাবি উঠছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও ফেনী জেলায় র‍্যাব-৭-এর অভিযানে অন্তত ১৪ জন নিহত হন। প্রায় প্রতিটি ঘটনায় র‍্যাবের দাবি ছিল, তারা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। তবে নিহতদের পরিবারের অভিযোগ, তাদের আগে থেকেই আটক করা হয়েছিল এবং পরে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা সাজিয়ে হত্যা করা হয়।

২০১৮ সালের ২৬ মে রাতে কক্সবাজারের টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ এলাকার মিঠাপানিতে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় কাউন্সিলর একরামুল হক নিহত হন। সে সময় র‍্যাব জানায়, মাদক কারবারিদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধের সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন এবং পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে র‍্যাব তাঁকে তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি বলেও দাবি করেছিল।

ঘটনার কয়েকদিন পর একরামুল হকের পরিবারের সংরক্ষিত একটি অডিও রেকর্ড প্রকাশ্যে আসে। সেখানে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর শেষ কথোপকথন, পরবর্তী গুলির শব্দ এবং তাঁর কণ্ঠ শোনা যায় বলে দাবি করা হয়। অডিওটি প্রকাশের পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ঘটনাটির তদন্তের দাবি জানায়। শুরু থেকেই একরামুলের পরিবারের অভিযোগ, এটি কোনো বন্দুকযুদ্ধ ছিল না; বরং তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।

একরামুলের স্ত্রী আয়েশা বেগম দীর্ঘদিন ধরে এ হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে আসছেন। তিনি বলেন, গত আট বছর ধরে তাঁর পরিবার একটি নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রকৃত ঘটনার বিচার প্রত্যাশা করে এসেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগপত্র দাখিলের ঘটনাকে তিনি সত্য উদ্ঘাটনের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আমার দেশ পত্রিকার সঙ্গে আলাপকালে আয়েশা বেগম বলেন, আট বছর ধরে তিনি এমন একটি দিনের অপেক্ষায় ছিলেন, যেদিন তাঁর স্বামীর মৃত্যুর ঘটনায় বিচারিক প্রক্রিয়া কার্যকরভাবে শুরু হবে। তাঁর ভাষায়, অভিযোগপত্র দাখিল এবং তৎকালীন র‍্যাব-৭ অধিনায়ক মিফতাহ উদ্দিন আহমেদকে সেনা হেফাজতে নেওয়ার ঘটনায় নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।

একরামুল হত্যা মামলার অগ্রগতির পর একই সময়ে র‍্যাব-৭-এর অধীনে সংঘটিত অন্যান্য কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাগুলোও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ওই সময় র‍্যাব-৭-এর নেতৃত্বে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল) মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ। তাঁর দায়িত্বকালে সংঘটিত অধিকাংশ অভিযানের বিষয়ে র‍্যাবের বক্তব্য একই ধরনের হলেও, একাধিক ঘটনায় নিহতদের পরিবার ও স্থানীয়দের পক্ষ থেকে ভিন্ন অভিযোগ ওঠে। ফলে এখন প্রশ্ন উঠেছে, একই সময়ের অন্যান্য ঘটনাও নতুন করে তদন্ত বা পর্যালোচনার আওতায় আসবে কি না।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, একরামুল হত্যা মামলায় আইনি অগ্রগতি কেবল একটি ঘটনার বিচার নয়; বরং একই সময়ে সংঘটিত অন্যান্য কথিত ক্রসফায়ারের ঘটনাগুলোও নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তাঁর মতে, প্রতিটি ঘটনার সত্য উদ্ঘাটনে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

২০১৬ থেকে ২০১৮: একের পর এক ‘বন্দুকযুদ্ধ’

২০১৬ সালের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ এলাকায় র‍্যাবের অভিযানে ইয়াকুব ও কামরুল নামে দুই ব্যক্তি নিহত হন। র‍্যাব জানায়, তারা ডাকাতির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এবং এর আগে স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

একই বছরের ২৯ অক্টোবর মীরসরাইয়ের ওয়াহেদপুর এলাকায় আরেক অভিযানে তিনজন নিহত হন। তাদের বিরুদ্ধেও ডাকাতির অভিযোগ আনে র‍্যাব।

২০১৭ সালের ৩ জুলাই ফেনীর বিরিঞ্চি এলাকায় বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন রুটি সোহেল নামে পরিচিত মো. সোহেল, যিনি ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হক হত্যা মামলার আসামি ছিলেন। একই বছরের ২০ অক্টোবর চট্টগ্রামের সদরঘাট এলাকায় অভিযানে নিহত হন বাইট্যা ফারুক নামে পরিচিত মোহাম্মদ ফারুক। র‍্যাব তাঁকে শীর্ষ ইয়াবা কারবারি বলে দাবি করেছিল।

২০১৮ সালে দেশব্যাপী মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু হওয়ার পর চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা আরও বাড়তে থাকে। ১৭ মে চট্টগ্রামের বরিশাল কলোনিতে অভিযানে নিহত হন পুলিশের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত হাবিবুর রহমান ওরফে মোটা হাবিব এবং মোশাররফ নামে এক টেম্পোচালক। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, মোশাররফ র‍্যাবকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করার পর তাকেও হত্যা করা হয়।

এরপর ২১ মে ফেনীর ধর্মপুরে আনোয়ার হোসেন, ২৬ মে টেকনাফে কাউন্সিলর একরামুল হক, ৩০ মে কক্সবাজার শহরের কবিতা চত্বরে মজিবুর রহমান, ১২ অক্টোবর চট্টগ্রামের মুরাদপুরে এক সন্দেহভাজন মাদক কারবারি এবং ২০ নভেম্বর টেকনাফে আরও দুজন র‍্যাবের অভিযানে নিহত হন।

আট বছরেও মেলেনি জাহিদের খোঁজ

২০১৮ সালের ১২ অক্টোবর চট্টগ্রামের মুরাদপুরে অভিযানের পর কর্ণফুলী উপজেলার ১৭ বছর বয়সী জাহিদ হাসানের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও আবার আলোচনায় এসেছে। পরিবারের দাবি, ওই অভিযানে ব্যবহৃত গাড়ির চালক ছিলেন জাহিদ এবং তিনি পুরো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। অভিযানের দুই দিন পর তাঁকে কর্ণফুলী এলাকা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকে তাঁর আর কোনো খোঁজ মেলেনি।

জাহিদের মা হোসনে আরা বেগম বলেন, তাঁর ছেলে কোনো অপরাধ করেনি। তাঁকে তুলে নেওয়ার পর থেকে পরিবার বহুবার র‍্যাব-৭ কার্যালয়ে গিয়েছে এবং মানববন্ধন করেছে, কিন্তু আট বছরেও তাঁর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর ছেলেকে গুম করা হয়েছে।

তবে জাহিদের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে উত্থাপিত অভিযোগের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো দায় স্বীকার করা হয়নি।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ