
তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের কেরানি আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ বাণিজ্য, দলিল লেখকদের হয়রানি, কমিশন বাণিজ্য এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কারণে অফিসে সেবাপ্রত্যাশীরা নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে দলিল লেখক, দাতা ও গ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে ক্ষোভ বাড়ছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
একাধিক সূত্র জানায়, আব্দুর রহমান কর্মজীবনের শুরুতে সাভার সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে নকল নবিস হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনকালে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে অফিসের কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দীর্ঘদিন কমিশন ও ঘুষ বাণিজ্য পরিচালনা করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ অনুযায়ী, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থে সাভারের রেডিও কলোনি এলাকায় কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচতলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন আব্দুর রহমান। এছাড়া সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকার বহুতল মার্কেটে একাধিক দোকান, পৌর এলাকার থানার পেছনে মূল্যবান স্থাবর সম্পদ, সাভার পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় প্রায় দেড় বিঘা জমির ওপর বাগানবাড়িসহ নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। পাশাপাশি রাজধানী ঢাকা এবং দেশের বাইরে অর্থ পাচারের মাধ্যমেও সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নিরপেক্ষ তদন্ত করলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।
সূত্রগুলোর দাবি, অতীতে নিজেকে আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দিলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমানে বিএনপি-সমর্থক পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন আব্দুর রহমান।
খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের দলিল লেখক জাহিদ হোসেন অভিযোগ করে বলেন, “আমরা কার্যত তাঁর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছি। বিভিন্ন অজুহাতে দলিল আটকে রাখা হয়। চাহিদামতো টাকা দিলে অল্প সময়েই কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়, আর টাকা দিতে না পারলে অকারণে হয়রানির শিকার হতে হয়।”
সূত্র জানায়, সাভারে নকল নবিস হিসেবে চাকরি শুরু করে পরে মোহরার পদে উন্নীত হন আব্দুর রহমান। এরপর খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে কেরানি হিসেবে যোগদান করেন। এর আগে ধামরাইয়ের কালামপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে কর্মরত থাকাকালে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগে দলিল লেখকদের আন্দোলনের মুখেও পড়েন তিনি। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার হয়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
অভিযোগ রয়েছে, খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে যোগদানের পর থেকে ঘুষ আদায়ের প্রবণতা আরও বেড়েছে। এক বছরের বেশি সময় ধরে তিনি সেখানে কর্মরত থাকলেও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অতীতে পরিদর্শন ও নিবন্ধন মহাপরিদর্শকের (আইজিআর) দপ্তরে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা পড়লেও সেগুলোর নিষ্পত্তি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে ধামরাইয়ের কালামপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে কর্মরত অবস্থায় আব্দুর রহমানের অর্থ লেনদেনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ২০ মে ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত ওই এক মিনিট ১০ সেকেন্ডের ভিডিওতে তাঁকে অর্থ গ্রহণ করতে দেখা যায় বলে অভিযোগ ওঠে। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হলেও তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলেও সমালোচনার জন্ম দেয়।
দলিল লেখকদের অভিযোগ, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতি দলিলে এনএন ফি বাবদ ৫৭২ টাকা নেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে এর চেয়ে বেশি অর্থ আদায় করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণের পরও কোনো রসিদ দেওয়া হয় না। অতিরিক্ত অর্থ কোন খাতে নেওয়া হয়, সে বিষয়ে কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যাও মেলে না। যারা অতিরিক্ত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানান, তাদের দলিল প্রক্রিয়াকরণে বিলম্ব, অযথা আপত্তি এবং বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক দলিল লেখক।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, কালামপুর থেকে খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে বদলি হয়ে আসার পর আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে ঘুষ আদায়ের অভিযোগ আরও বেড়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী দলিল লেখক ও সেবাপ্রত্যাশীরা।

