
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা আরবরিকালচার (বৃক্ষ পালন) বিভাগে টেন্ডার কার্যক্রম, ফাইল অনুমোদন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিভাগের প্রধান বৃক্ষপালনবিদের দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ। অভিযোগ রয়েছে, ঘুষ বা কমিশন ছাড়া তিনি কোনো টেন্ডার ফাইল কিংবা গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক নথিতে স্বাক্ষর করেন না। তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার বাণিজ্য এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক দাবি করেন, এ বিভাগে কাজ করতে গেলে নির্ধারিত কমিশন দেওয়া যেন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। তাদের ভাষ্য, অর্থের বিনিময়ে ফাইল দ্রুত অনুমোদন হলেও কমিশন না দিলে নানা অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হয়। এতে ঠিকাদারদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নও বিলম্বিত হচ্ছে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন গণপূর্ত অধিদপ্তরের আরবরিকালচার বিভাগ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় বৃক্ষরোপণ, ল্যান্ডস্কেপিং, ফুলের বাগান নির্মাণ, গাছের পরিচর্যা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সরকারি নার্সারিতে চারা উৎপাদনের দায়িত্ব পালন করে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বঙ্গভবন, সচিবালয়, জাতীয় সংসদ ভবনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সৌন্দর্য ও সবুজায়নের কাজ এই বিভাগের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এসব কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সীমিত দরপত্র (এলটিএম) পদ্ধতির পরিবর্তে ধারাবাহিকভাবে উন্মুক্ত দরপত্র (ওটিএম) পদ্ধতি ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দরপত্র আহ্বানের আগে থেকেই রেট নির্ধারণ ও কাজ বণ্টনের বিষয়ে সমঝোতা করা হতো, যার মাধ্যমে কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি, ২৭ জানুয়ারি এবং ৪ ফেব্রুয়ারি—এই তিন দিনে মোট প্রায় ৩৯টি ওটিএম দরপত্র আহ্বান করা হয়। একই সময়ে এত বিপুলসংখ্যক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের ঘটনায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ঠিকাদারদের মধ্যেও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অন্য কোনো সিভিল বিভাগে একই সময়ে এ ধরনের ব্যাপক ওটিএম দরপত্রের নজির নেই।
আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প তদারকি, বিল অনুমোদন, প্রশাসনিক ছাড়পত্র এবং বিভিন্ন ফাইল প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা আদায়ের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ঠিকাদার ও বিভাগীয় সূত্রের দাবি, অধিকাংশ ফাইলে প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দাবি করা হয়। কমিশন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফাইলে স্বাক্ষর করা হয় না বলেও অভিযোগ তাদের।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সবুজায়ন ও সরকারি স্থাপনার সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য সরকার প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দিলেও অনিয়ম ও কমিশন বাণিজ্যের কারণে কাজের মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে একই ধরনের কাজ বারবার করতে হচ্ছে, যা সরকারি অর্থের অপচয় বাড়াচ্ছে বলে তারা দাবি করেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪; দণ্ডবিধি, ১৮৬০; দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। একইভাবে কোনো ঠিকাদারের বিরুদ্ধে অনিয়ম প্রমাণিত হলে তাকে কালো তালিকাভুক্ত করা, জামানত বাজেয়াপ্ত করা এবং প্রচলিত আইনে শাস্তির আওতায় আনার বিধানও রয়েছে।

