
গণপূর্ত অধিদপ্তরের টাঙ্গাইল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শম্ভু রাম পালের বিরুদ্ধে টেন্ডারে অনিয়ম, পার্সেন্টেজ বাণিজ্য, সরকারি প্রকল্পে কারিগরি জালিয়াতি, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শম্ভু রাম পাল ২০১৭ সালের শুরু থেকে ২০১৮ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রথম দফায় টাঙ্গাইল গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা কারাগার, ফায়ার সার্ভিস, সিভিল স্টেশন, সিজেএম আদালতসহ বিভিন্ন প্রকল্পে মেসার্স নূরানী কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, বিথী কনস্ট্রাকশন ও মৃত্তিকা এন্টারপ্রাইজকে এলটিএম ও ওটিএম পদ্ধতিতে একের পর এক কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব প্রকল্পে নিম্নমানের কাজ করিয়ে পার্সেন্টেজ বাবদ বড় অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও প্রকৌশলগত ত্রুটির কারণে তিনজন শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনার পর ২০১৮ সালের শেষ দিকে তাকে মেহেরপুরে বদলি করা হয়। পরবর্তীতে সেখানেও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। পরে আবার টাঙ্গাইলে ফিরে এসে আগের মতোই নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে প্রায় ৯ কোটি ৭০ লাখ টাকার চুক্তিতে টাঙ্গাইলে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শকের কার্যালয় নির্মাণকাজ মৃত্তিকা এন্টারপ্রাইজকে পাইয়ে দেওয়া হয়। কাজটি পাওয়ার জন্য আরেকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ (জেভি) গঠন করা হয় এবং এর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের পার্সেন্টেজ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে জেলা কারাগারের পাঁচতলা সেল ভবন নির্মাণ প্রকল্পেও টেন্ডার কারসাজির মাধ্যমে একটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া দ্বিতীয় দফায় টাঙ্গাইলে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে শম্ভু রাম পালের বিরুদ্ধে টেন্ডারে পক্ষপাতিত্ব, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারে প্রশ্রয়, বিল ছাড়ে কমিশন গ্রহণ, ঘুষের বিনিময়ে বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদন, ভূমি অধিগ্রহণে অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে অনৈতিক সুবিধা নেওয়া এবং প্রকল্প তদারকিতে গাফিলতির অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ২৫০ শয্যার হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীতকরণ প্রকল্পে প্রায় ১ কোটি ৭৯ লাখ টাকার রেট্রোফিটিং ও মেরামতকাজ নূরানী কনস্ট্রাকশনকে দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রাক্কলন (ওভার এস্টিমেট) এবং নিম্নমানের কাজের মাধ্যমে ওই প্রকল্প থেকে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।
একই সময়ে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রকল্পের আওতায় হাসপাতাল ভবন, চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের আবাসন, মসজিদ, জেনারেটর, সীমানাপ্রাচীর, অভ্যন্তরীণ সড়ক, সাবস্টেশন, লিফট, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, ভিআরএফ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, ফায়ার সেফটি, সোলার সিস্টেম, পানি সরবরাহ, ড্রেনেজ ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণকাজেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ও কারিগরি অনিয়মের কারণে প্রকল্পগুলো হস্তান্তরের অল্প সময়ের মধ্যেই সংস্কার ও মেরামতের প্রয়োজন হয় এবং প্রতিবছর নতুন করে বরাদ্দ দেখিয়ে সরকারি অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে।
এছাড়া গোপালপুর ও কালিহাতী ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, জেলা কারাগার, পুলিশ লাইনস, পুলিশ হাসপাতাল, মির্জাপুর থানা, নাগরপুর কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, সাগরদীঘি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র ও জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়সহ একাধিক সরকারি প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রাক্কলন, কারিগরি জালিয়াতি এবং নিম্নমানের কাজের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় ঠিকাদারদের অভিযোগ, শম্ভু রাম পাল নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কাজ করে টেন্ডার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নষ্ট করছেন। অনুমোদিত প্রাক্কলনের (এস্টিমেট) কপি অনৈতিকভাবে সরবরাহ, ভূমি অধিগ্রহণে অতিরিক্ত মূল্য দেখানো এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে নকশা ও শর্ত উপেক্ষা করে নিম্নমানের কাজের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার দাবি করেছেন, টাঙ্গাইলে তার আগের দায়িত্বকালেও একই ধরনের অনিয়মের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাদের অভিযোগ, বর্তমানে “পরিবেশ ভবন” নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদিত প্রাক্কলনও একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারের কাছে আগাম সরবরাহ করা হয়েছে এবং এর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধা নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা দাবি করেন, নির্বাহী প্রকৌশলী শম্ভু রাম পালের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ থাকলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

