
যৌন হয়রানি, একাডেমিক দুর্নীতি, কর্মস্থলে অনুপস্থিতি ও জালিয়াতিসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গত পাঁচ বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) পাঁচ শিক্ষক-কর্মকর্তাকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৪৮তম সিন্ডিকেট সভায় যৌন হয়রানি ও একাডেমিক দুর্নীতির অভিযোগে পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক প্রভাস কুমারকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়।
এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাদিকুল ইসলাম সাগরকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, অধ্যাপক প্রভাস কুমারের বিরুদ্ধে নিজ বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানি এবং একাডেমিক দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। অভিযোগের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটিগুলোর প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর উচ্চতর তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সিন্ডিকেট তার স্থায়ী চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত নেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরই সিন্ডিকেট তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের আগস্টে নিজ বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে চেম্বারে ডেকে যৌন হয়রানি করার অভিযোগ ওঠে অধ্যাপক প্রভাস কুমারের বিরুদ্ধে। পরে ওই শিক্ষার্থীর মা বিভাগের সভাপতির কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।
অভিযোগের তদন্তে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অধিকতর তদন্তের উদ্যোগ নেয়। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পর গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রভাস কুমারকে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
তদন্ত শেষে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় চলতি বছরের সর্বশেষ সিন্ডিকেট সভায় তাকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
যৌন নিপীড়নের অভিযোগে সাদিকুল বরখাস্ত
চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৪৫তম সিন্ডিকেট সভায় আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাদিকুল ইসলাম সাগরকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, বরখাস্ত হওয়ায় তিনি পেনশনসহ কোনো ধরনের সরকারি সুবিধা পাবেন না।
সাদিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ২৬ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে। পরদিন বিষয়টি তদন্তে বিভাগীয় কমিটি গঠন করা হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৩৩তম সিন্ডিকেট সভায় তাকে সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়। তদন্ত শেষে চলতি বছরের জানুয়ারিতে তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত শাস্তির সিদ্ধান্ত নেয় সিন্ডিকেট।
২০২২ সালে চাকরি হারান দুই শিক্ষক
এর আগে ২০২২ সালের ২৯ মে রাতে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১৪তম সিন্ডিকেট সভায় অনিয়মের অভিযোগে মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক উম্মে হাবিবা জেসমিন এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক সালমা খাতুনকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়।
উম্মে হাবিবার বিরুদ্ধে বিধিবহির্ভূতভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা, অনুমতি ছাড়া ছুটিতে থাকা এবং ছাড়পত্র না নিয়ে বিদেশে অবস্থানের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন করা হলে তদন্তে তা প্রমাণিত হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী তাকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেয় সিন্ডিকেট।
অন্যদিকে অধ্যাপক সালমা খাতুনের বিরুদ্ধে সুপারভাইজার ও চিকিৎসকের স্বাক্ষর জাল করে মাতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়ার অভিযোগ ছিল। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তাকেও স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়।
চিকিৎসকও চাকরিচ্যুত
শিক্ষকদের পাশাপাশি গত পাঁচ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রের উপপ্রধান চিকিৎসক ডা. রাজু আহমেদকেও স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
২০২৪ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত ৫৩১তম সিন্ডিকেট সভায় যৌন হয়রানির অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পর তার চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়। তার বিরুদ্ধে এক কিশোরীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছিল। পরে এ ঘটনায় মামলাও হয়।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে ছাড় নয়: উপাচার্য
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, শিক্ষক-কর্মকর্তা যেই হোন না কেন, অনিয়ম, দুর্নীতি কিংবা যৌন হয়রানির মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো ধরনের ছাড় দেবে না। একই সঙ্গে অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাও প্রশাসনের দায়িত্ব।

