Sunday, August 23, 2026

বেরোবিতে বাস মেরামতে ২৮ লাখ টাকা ব্যয়, অ্যাম্বুলেন্সে ২ লাখ খরচের পরও চলেনি একদিন

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে ব্যবহৃত একটি বাস মেরামতে ২৭ লাখ ৯৯ হাজার টাকা ব্যয় দেখিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একইভাবে পুরোনো একটি অ্যাম্বুলেন্স মেরামতের জন্য আরও ২ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও মেরামতের পর সেটি একদিনের জন্যও চলাচল করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।

বাস ও অ্যাম্বুলেন্স মেরামতের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলের ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে অভিযোগ তদন্ত এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে একটি খোলা চিঠিও দেওয়া হয়েছে।

বাস মেরামতে প্রায় ২৮ লাখ টাকা

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত একটি বাস বিকল হয়ে পড়লে সেটি মেরামতের জন্য ‘ফ্রেন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হয়। মেরামত শেষে প্রতিষ্ঠানটিকে ২৭ লাখ ৯৯ হাজার টাকা পরিশোধ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের দাবি, বাসটি মেরামতের জন্য পত্রিকায় দরপত্র বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মেরামতের নামে মূলত বাসের বাইরের অংশে রং করা এবং ইঞ্জিনে কিছু কাজ করেই বিপুল অর্থ ব্যয় দেখানো হয়েছে।

এ ছাড়া মেরামতের ব্যয়ের একটি অংশ পরিবহন পুলের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অ্যাম্বুলেন্সে ২ লাখ টাকা ব্যয়, চলেনি একদিনও

বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো একটি অ্যাম্বুলেন্স মেরামতের জন্য আরও ২ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। কিন্তু মেরামতের পর সেটি একদিনের জন্যও ব্যবহার করা হয়নি এবং বর্তমানে গ্যারেজে পড়ে রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা।

তাদের দাবি, অল্প কিছু কাজ করার পর বাকি অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা ভাগ-বাঁটোয়ারা করেছেন। যদিও এ অভিযোগেরও কোনো স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বাস ও অ্যাম্বুলেন্স মেরামতে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে আলোচনা শুরু হয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা পরিবহন পুলের ব্যয় ও মেরামতের কাজ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

‘২৮ লাখে নতুন বাস কেনা যেত’

একটি বাস মেরামতেই প্রায় ২৮ লাখ টাকা ব্যয় হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের প্রশ্ন, এত টাকা ব্যয় করে পুরোনো বাস মেরামতের পরিবর্তে নতুন বাস কেনার উদ্যোগ নেওয়া যেত কি না।

অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের শিক্ষার্থী আহমেদুল হক আলবির বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবহন সংকটের পাশাপাশি দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। একটি বাস মেরামতে ২৮ লাখ টাকা ব্যয় করার তথ্য জানার পর তাদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তার মতে, বাসটিতে কী কী কাজ করা হয়েছে এবং কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, তা প্রকাশ করা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, মেরামতের পেছনে যদি এত টাকা ব্যয় করতে হয়, তাহলে অতিরিক্ত কিছু অর্থ যোগ করে নতুন বাস কেনা সম্ভব ছিল কি না, সেটিও বিবেচনা করা উচিত ছিল।

গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী মাসুদ, ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী সানজিদাসহ আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীও একই ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন। তারা পরিবহন পুলের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

ব্যয়ের খাতভিত্তিক হিসাব প্রকাশ হয়নি

বাস মেরামতে প্রায় ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ের তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলের পরিচালক ও ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাসুদ রানা লিখিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

গত ১৪ আগস্ট পরিবহন পুল নিয়ন্ত্রিত একটি ফেসবুক গ্রুপে দেওয়া ব্যাখ্যায় তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি বাস দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পরিবহন শেডের বাইরে পড়ে ছিল। এর মধ্যে একটি বাস মেরামতযোগ্য হওয়ায় এর বডি, ইঞ্জিনসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন অংশ পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তবে তার ব্যাখ্যায় ২৭ লাখ ৯৯ হাজার টাকা কোন কোন খাতে কত ব্যয় হয়েছে, তার বিস্তারিত খাতভিত্তিক হিসাব দেওয়া হয়নি। বডি, ইঞ্জিনসহ বিভিন্ন অংশ পুনর্নির্মাণের কথা বলা হলেও প্রতিটি কাজের বিপরীতে ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি।

এ কারণে মেরামতের কাজের পরিমাণ এবং ব্যয়ের যৌক্তিকতা যাচাই করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজের পরিবর্তে পরিবহন পুল পরিচালকের নিয়ন্ত্রিত একটি ফেসবুক গ্রুপে ব্যাখ্যা দেওয়ার বিষয়টিও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

‘নতুন বাস ৫৫ লাখ টাকার নিচে পাওয়া যায় না’

পরিবহন পুলের পরিচালক মাসুদ রানা সাংবাদিকদের বলেন, নতুন একটি বাস কিনতে ৫৫ লাখ টাকার কম লাগে না। পুরোনো বাসটির সম্পূর্ণ বডি মেরামত করা হয়েছে বলেই ব্যয় বেশি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

মেরামতের কাজের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, কাজটি কমিটির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। উপাচার্য কমিটি গঠন করে দেওয়ার পর কমিটি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এরপর সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

উপাচার্যের বক্তব্য

বাস ও অ্যাম্বুলেন্স মেরামতে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ এবং এ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্নের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকত আলীর বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরিবহন পুলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।

এখন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মূল প্রশ্ন, ২৭ লাখ ৯৯ হাজার টাকা ব্যয়ে বাসটিতে প্রকৃতপক্ষে কী কী কাজ করা হয়েছে এবং অ্যাম্বুলেন্স মেরামতে ২ লাখ টাকা কোন কোন খাতে ব্যয় হয়েছে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তারা দরপত্র, কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার এবং কাজের খাতভিত্তিক ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ