
দেশের প্রধান দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গত প্রায় পাঁচ মাস ধরে পূর্ণাঙ্গ কমিশন ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ না হওয়ায় সংস্থাটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নতুন অনুসন্ধান, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
দুদকের সর্বশেষ চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন চলতি বছরের ৩ মার্চ পদত্যাগ করার পর থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত নতুন কমিশন গঠন করা হয়নি। এর ফলে সংস্থাটির চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ের মধ্যে প্রায় ১৩ হাজার দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে। তবে কমিশন না থাকায় অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে নতুন অনুসন্ধান শুরু, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযান, সম্পদ জব্দ, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা কিংবা গ্রেপ্তারসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমও উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
দুদকের প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটাই সবচেয়ে দীর্ঘ সময় কমিশনশূন্য থাকার ঘটনা। ২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর প্রতিষ্ঠার পর বিচারপতি সুলতান হোসেন খানের নেতৃত্বে প্রথম কমিশন থেকে শুরু করে ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের কমিশন পর্যন্ত মোট সাতটি কমিশন দায়িত্ব পালন করেছে। এর মধ্যে মাত্র তিনটি কমিশন পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পেরেছে, আর বাকি চারটি মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দায়িত্ব ছাড়ে।
দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মইদুল ইসলাম বলেন, আইন অনুযায়ী আগের কমিশন পদত্যাগের ৩০ দিনের মধ্যে শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়ার কথা। তাঁর ভাষ্য, পাঁচ মাস ধরে দেশের একমাত্র সাংবিধানিক ক্ষমতাসম্পন্ন দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাকে কমিশনবিহীন রাখা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং এতে দুর্নীতি দমন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, কমিশন না থাকায় কর্মকর্তারা অনুসন্ধান ও তদন্তের প্রতিবেদন প্রস্তুত করলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে নতুন অনুসন্ধান, ফাঁদ মামলা, আসামি গ্রেপ্তার, এমনকি জামিনের বিরুদ্ধে আপিল করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও স্থগিত রয়েছে। এতে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা সুবিধা পাচ্ছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দুদকের নবনিযুক্ত সচিব মো. সাইদুর রহমান খান বলেন, সার্চ কমিটির কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তাঁর জানা মতে, নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে খুব শিগগিরই নতুন কমিশন গঠন করা হবে। তবে সার্চ কমিটির কার্যক্রমে দুদকের কোনো প্রতিনিধিত্ব না থাকায় অভ্যন্তরীণ অগ্রগতি সম্পর্কে সংস্থার জানার সুযোগ নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুদক আইন অনুযায়ী গঠিত সার্চ কমিটি নিয়ে কিছু আইনি প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর মতে, দুদকের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক বা দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে যোগ্য, সৎ, দক্ষ এবং স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।
গত ২২ জুন আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হককে সভাপতি করে চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। এরপর আবেদন আহ্বান করলে তিন শতাধিক আবেদন জমা পড়ে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে ১৮ থেকে ২০ জনের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
সূত্রগুলো জানায়, চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, সাবেক সচিব, সাবেক সেনা কর্মকর্তা, আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রশাসনের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিদের নাম আলোচনায় রয়েছে। তবে চূড়ান্ত নিয়োগের বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
দুদক আইন, ২০০৪ অনুযায়ী কমিশন একজন চেয়ারম্যান ও দুইজন কমিশনারের সমন্বয়ে গঠিত হবে। সার্চ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগ দেন এবং তাঁদের মেয়াদ পাঁচ বছর। একই আইনে চেয়ারম্যান বা কমিশনার হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রে সততা, সুনাম, পেশাগত দক্ষতা এবং প্রশাসন, বিচার বিভাগ, আইন, পুলিশ, রাজস্ব বা সমজাতীয় ক্ষেত্রে অন্তত ২০ বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত উল্লেখ রয়েছে।
দুদকের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কমিশন ছাড়া সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। ফলে প্রায় পাঁচ মাস ধরে সংস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তাঁদের মতে, যত দ্রুত সম্ভব নতুন কমিশন গঠন করা হলে দুর্নীতি দমন কার্যক্রম আবারও স্বাভাবিক গতি ফিরে পাবে।

