
ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার প্রকল্পে কাজ সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারকে প্রায় ৩২৭ কোটি টাকার বিল পরিশোধ, ক্রয়বিধি লঙ্ঘন, অতিরিক্ত অর্থ প্রদান এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এবং সরকারের অডিট বিভাগের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। আইএমইডির হিসাবে প্রকল্পে মোট ৪ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও অডিট আপত্তি চিহ্নিত হয়েছে।
দেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা পূরণ এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে ২০১৮ সালে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুরু করে। শুরুতে ২০২২ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ একাধিকবার বৃদ্ধি করা হয়।
প্রথম সংশোধনীতে প্রকল্পের ব্যয় ১০ হাজার ৪৬০ কোটি ৯১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫ হাজার ৫০০ কোটি ২০ লাখ টাকা করা হয়, যা প্রাথমিক ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ৪৮ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদও দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে আরও দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হলেও প্রকল্পের কাজ এখনও সম্পূর্ণ শেষ হয়নি। আইএমইডির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রেললাইনসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় পুরো প্রকল্প শেষ হতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৯-২০ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পে মোট ৬৮টি অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮টি নিষ্পত্তি হলেও ৩০টি এখনও অনিষ্পন্ন রয়েছে। অডিটে আপত্তিকৃত অর্থের পরিমাণ ৪ হাজার ৭৫৮ কোটি ৪ লাখ টাকার বেশি। পাশাপাশি ৭৪ কোটি ৮৩ লাখ মার্কিন ডলার এবং ৩ হাজার ৪৩৪ কোটি ৯২ লাখ জাপানি ইয়েন সংশ্লিষ্ট আর্থিক অনিয়মও চিহ্নিত হয়েছে।
সবচেয়ে বড় অডিট আপত্তি এসেছে প্রকল্পের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে। কারখানার বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৯ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন নির্ধারণ করা হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৮ লাখ ১৪ হাজার ৭৫৬ মেট্রিক টন। এ উৎপাদন ঘাটতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২ হাজার ২১৩ কোটি টাকারও বেশি অডিট আপত্তি এখনও নিষ্পত্তি হয়নি।
আইএমইডির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কারখানায় কোল কনভেয়ার বেল্ট ছিঁড়ে যাওয়া, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, স্ট্রিপার লিকসহ বিভিন্ন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে নিয়মিত উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সফটওয়্যারনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রপাতি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে যান্ত্রিক ক্ষতির ঝুঁকিও বাড়ছে।
প্রকল্পের মূল প্ল্যান্ট স্থাপনের ক্রয় প্রক্রিয়ায় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর)-২০০৮ লঙ্ঘনের অভিযোগও উঠে এসেছে। অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যোগসাজশের মাধ্যমে প্রায় ৭৩ কোটি মার্কিন ডলার এবং ৩ হাজার ৩০০ কোটি জাপানি ইয়েনের সমন্বিত কাজ একটি সাধারণ ঠিকাদারকে দেওয়া হয়েছে।
আবাসিক ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। প্যাকেজ-ডব্লিউ-১-এর ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন দরদাতাকে অযোগ্য ঘোষণা করে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতার সঙ্গে চুক্তি করা হয়। অডিট বিভাগ পুরো প্রক্রিয়াকে ‘কোলিউসিভ প্র্যাকটিস’ বা পারস্পরিক যোগসাজশ হিসেবে উল্লেখ করেছে। একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে প্যাকেজ-ডব্লিউ-২-এর ক্ষেত্রেও।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হওয়ার আগেই ঠিকাদারকে ‘ফাইনাল এক্সেপ্টেন্স সার্টিফিকেট’ প্রদান করা হয়। এর ভিত্তিতে ১ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার ও ১৩৪ কোটি জাপানি ইয়েন পরিশোধ করা হয়। এছাড়া কাজ সম্পন্ন না করেই বিভিন্ন খাতে টাকা, ডলার ও ইয়েনে বিল পরিশোধের ঘটনা চিহ্নিত হয়েছে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী এসব অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩২৭ কোটি টাকা।
অডিট প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকৃত কাজের তুলনায় অতিরিক্ত মাটি ভরাট, চুক্তি লঙ্ঘন করে বিল পরিশোধ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী গ্রহণ, সীমিত দরপত্র পদ্ধতির অপব্যবহার, পরিবেশ ও সামাজিক তদারকির প্রমাণ ছাড়াই অর্থ ব্যয়, পোর্ট ও শিপিং চার্জে অতিরিক্ত বিল, প্রকল্পের অর্থ অন্য হিসাব নম্বরে স্থানান্তর এবং অনুমোদন ছাড়া পরামর্শক পরিবর্তনের মতো একাধিক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।
এছাড়া রেলওয়ে ও তিতাস গ্যাস কোম্পানিকে সমঝোতা স্মারক ছাড়া বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রদান, সংশোধিত এডিপির বরাদ্দের বাইরে অতিরিক্ত ব্যয়, প্রকল্পের আওতায় পেনশন ও গ্র্যাচুইটি পরিশোধ এবং বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়ার পরও প্রকল্পের অর্থ থেকে গ্যাস বিল পরিশোধের বিষয়েও অডিট আপত্তি রয়েছে।
আইএমইডির প্রতিবেদনে প্রকল্পের অবকাঠামোগত মান নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আবাসিক ভবনে নিম্নমানের ইট ব্যবহার, টাইলস ও ফিনিশিংয়ের ত্রুটি, স্কুল-কলেজ ভবনের বারান্দার রেলিংয়ের উচ্চতা নিরাপত্তা মানের নিচে থাকা এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহারে অবহেলার বিষয়গুলো প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কর্মকর্তাদের আবাসনের জন্য বিপুল জমি ব্যবহার করে ৪৯টি পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করলে জমির আরও কার্যকর ব্যবহার সম্ভব ছিল। একই সঙ্গে উৎপাদিত সারের ৪০ শতাংশ রেলপথে পরিবহনের পরিকল্পনা থাকলেও রেললাইন নির্মাণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় বর্তমানে সড়কপথের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
তবে এসব অনিয়মের মধ্যেও দেশের প্রথম ‘গ্রিন ফার্টিলাইজার প্ল্যান্ট’ হিসেবে পরিচিত এ কারখানায় সার উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে। ২০২৪ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়ার পর থেকে কারখানাটি প্রায় ১৭ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার উৎপাদন করেছে, যা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে ভূমিকা রাখছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মো. সাইদুর রহমান কাজ শেষ হওয়ার আগেই ‘ফাইনাল এক্সেপ্টেন্স সার্টিফিকেট’ প্রদান এবং ৩২৭ কোটি টাকা পরিশোধের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, প্রকল্পের একটি অংশ বাংলাদেশ রেলওয়ের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত হওয়ায় সেই কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণা করা সম্ভব নয়। এছাড়া আবাসন খাতের কিছু কাজ এখনও বাকি রয়েছে। তাঁর দাবি, ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই সব কাজ শেষ হবে। তিনি আরও জানান, ২০২৪ সালের ১ জুলাই প্রকল্পের কমিশনিং সম্পন্ন হওয়ার পর তিনি প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

