শনিবার, আগস্ট ১, ২০২৬

চাকরির পাশাপাশি ডেভেলপার ব্যবসার অ’ভিযোগ, গণপূর্তের ৫ প্রকৌশলীকে ঘিরে চাঞ্চল্য

সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে সরকারি চাকরির পাশাপাশি ডেভেলপার ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কয়েকজন ডিপ্লোমা প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়েছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাভার বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার খান আনুসহ পাঁচজন ডিপ্লোমা প্রকৌশলী যৌথভাবে আবাসন ব্যবসা পরিচালনা করছেন। একই সঙ্গে তাঁদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারেরও নানা অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো সরকারি কর্মচারী সরাসরি ব্যবসা পরিচালনা, বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়া বা কোনো লাভজনক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। একই বিধিমালায় নিজ নামে বা পরিবারের সদস্যদের নামে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রয়েছে। এসব বিধি লঙ্ঘন করলে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে, যার মধ্যে তিরস্কার, পদাবনতি, চাকরি থেকে বরখাস্ত বা অপসারণের বিধানও রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৬ সালের দিকে সাভার ডিওএইচএস এলাকায় উপসহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার খান আনু ও মিজানুর রহমান ডেভেলপার ব্যবসা শুরু করেন। পরে উপসহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) আবুল বাশার, উপসহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আব্দুর রউফ এবং সহকারী প্রকৌশলী গোল নাহার এ ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, তাঁরা ঠিকাদার কাজলকে সঙ্গে নিয়ে ‘ডালাস ডেভেলপারস অ্যান্ড প্রোপার্টিজ লিমিটেড’ নামে সাভার ডিওএইচএস এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণ করে ফ্ল্যাট বিক্রি করছেন। এ ব্যবসার বিভিন্ন কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন অভিযুক্তদের স্বজনরা। এছাড়া উত্তরা এলাকাতেও তাঁদের নতুন আবাসন প্রকল্প পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। সেখানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা বিনিয়োগ করেছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, সাভার নবীনগর ডিওএইচএসের ৬ নম্বর সড়কের ১১৮ ও ১১৯ নম্বর প্লটে নির্মিত ভবনের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে এবং ফ্ল্যাট বিক্রি সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া একই এলাকার ৩ নম্বর সড়ক এবং ৯ নম্বর সড়কের ২৬৯, ২৭০ ও ২৭১ নম্বর প্লটে নতুন ভবনের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্পে ‘ডালাস ডেভেলপারস অ্যান্ড প্রোপার্টিজ’ নামে ফ্ল্যাট বিক্রির প্রচারণাও চলছে। প্রতিষ্ঠানটির করপোরেট অফিস হিসেবে মিরপুর ডিওএইচএসের একটি ঠিকানা ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, উপসহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার খান আনু দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে সাভারেই দায়িত্ব পালন করছেন। অপরদিকে মিজানুর রহমান প্রায় ১০ বছর সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধ এলাকার দায়িত্বে ছিলেন। এ সময় ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের উত্তরা-আশুলিয়া-বাইপাইল-সাভার ইপিজেড অংশের ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ (ভ্যালুয়েশন) কার্যক্রমে দায়িত্ব পালনকালে তাঁরা অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল অর্থ অর্জন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে অনিয়মের মাধ্যমে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করে বিপুল অঙ্কের ঘুষ নেওয়া হয়েছে। এমনকি একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতিপূরণ ৩ কোটি টাকা থেকে ১৬ কোটি টাকা নির্ধারণ করে সেখান থেকে ৮ কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহার, ঠিকাদারি ব্যবসায় পরোক্ষ বিনিয়োগ এবং বিদেশে নিয়মিত ভ্রমণের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি বিভিন্ন সময়ে ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে সফর করেছেন। এছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, মিজানুর রহমান তাঁর ভাইয়ের নামে ‘ফিউচার ড্রিম বিল্ডার্স লিমিটেড (এফডিবিএল)’ নামে আরেকটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন। পাশাপাশি কানাডার বেগমপাড়ায় তাঁর বাড়ি রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বপক্ষে সংশ্লিষ্ট কোনো সরকারি নথি প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।

অন্যদিকে সহকারী প্রকৌশলী আবুল বাশারের বিরুদ্ধেও জাতীয় স্মৃতিসৌধসহ বিভিন্ন প্রকল্পে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, স্ত্রী সহকারী প্রকৌশলী গোল নাহারের সঙ্গে মিলে তাঁরা সাভার, গাজীপুর ও ধামরাই এলাকায় নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মালিক হয়েছেন। এছাড়া মাটি, ড্রেজার, বিপণিবিতান, গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন ব্যবসায় তাঁদের বিনিয়োগ রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে জানা যায়, সাভার ডিওএইচএস এলাকায় প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এ সময় সম্ভাব্য ক্রেতা পরিচয়ে যোগাযোগ করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথোপকথনে অভিযুক্তদের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার বিষয়ে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত অডিওসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ