শুক্রবার, জুলাই ৩১, ২০২৬

নামজারি থেকে খাজনা—সব সেবায় ঘু’ষে’র অ’ভিযোগ, আলোচনায় সাতক্ষীরা সদর ভূমি অফিস

সাতক্ষীরা সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে (এসিল্যান্ড অফিস) ঘুষ, অনিয়ম ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. বদরুদ্দোজা এবং সহকারী ভূমি কর্মকর্তা (নায়েব) শর্মিষ্ঠা সরকার। ভুক্তভোগী ও একাধিক সূত্রের দাবি, অফিসটিতে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন ভূমিসেবা পরিচালিত হচ্ছে এবং ঘুষ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, নামজারি, প্রতিবেদন, খাজনা, ইজারা ও বিভিন্ন ভূমিসংক্রান্ত সেবা গ্রহণের জন্য অফিসে আসা সেবাগ্রহীতাদের প্রথমে বিভিন্ন অজুহাতে হয়রানি করা হয়। পরে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে তাদের নায়েব শর্মিষ্ঠা সরকারের কাছে পাঠানো হয়। সেখানে বিভিন্ন জটিলতার কথা বলে ফাইল আটকে রেখে ঘুষের বিনিময়ে কাজ সম্পন্ন করার প্রস্তাব দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, নামজারির জন্য প্রায় ৬ হাজার টাকা, প্রতিবেদন প্রদানে ২ হাজার টাকা, খাজনা-সংক্রান্ত কাজে ১ হাজার টাকা এবং জটিল জমির বিভিন্ন বিষয়ে আরও বেশি অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সরকার নির্ধারিত ফি ছাড়াও অতিরিক্ত অর্থ না দিলে অনেক ক্ষেত্রে ফাইলের কার্যক্রম এগোয় না।

একাধিক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, নায়েব শর্মিষ্ঠা সরকারকে প্রায়ই নিজের দপ্তরের পরিবর্তে এসিল্যান্ডের কক্ষে দেখা যায়। বিভিন্ন তদন্তে বাইরে যাওয়ার সময়ও তিনি এসিল্যান্ডের সঙ্গে থাকেন বলে দাবি করেন তারা। এ কারণে অফিসে সেবা নিতে আসা অনেক মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও প্রয়োজনীয় কর্মকর্তার সাক্ষাৎ পান না এবং ভোগান্তির শিকার হন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সেবাগ্রহীতা দাবি করেন, শর্মিষ্ঠা সরকারের সঙ্গে এসিল্যান্ডের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। তাদের অভিযোগ, এ সম্পর্ককে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক প্রভাবও বিস্তার করা হচ্ছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, একপর্যায়ে শর্মিষ্ঠা সরকারকে পাশের ফিংড়ী ভূমি অফিসে বদলি করা হলেও তিনি বিভিন্ন অজুহাতে নিয়মিত সদর এসিল্যান্ড কার্যালয়ে যাতায়াত করেন এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার অব্যাহত রাখেন।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আদালতের আদেশ থাকা সত্ত্বেও কিছু নামজারির আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয়। পরে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে সেই ফাইল পুনরায় সচল করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নের আখড়াখোলা এলাকার বাসিন্দা গীতা রানী অভিযোগ করেন, আদালতের রায়ের পর নামজারির আবেদন নিয়ে সদর ভূমি অফিসে গেলে প্রথমে সার্ভেয়ার তারেক তাকে নায়েব শর্মিষ্ঠা সরকারের কাছে পাঠান। সেখানে তার কাছে প্রথমে ২ লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে দরকষাকষির পর ১ লাখ টাকায় কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন। তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

আরেক ভুক্তভোগী শহরের থানাঘাটা গ্রামের ফারুক হোসেন অভিযোগ করেন, তার একটি জমির ১৪৫ ধারার মামলার প্রতিবেদনের জন্য অর্থ দাবি করা হয়েছিল। তিনি অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে প্রতিপক্ষের পক্ষে প্রতিবেদন দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন। এ ঘটনার প্রতিবাদে তিনি সংবাদ সম্মেলনও করেছেন বলে জানান।

আরও কয়েকজন ভুক্তভোগীর দাবি, সদর ভূমি অফিসে ঘুষের অর্থ লেনদেনের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন নায়েব শর্মিষ্ঠা সরকার। তার অনুমোদনের পরই বড় ধরনের ফাইলের কার্যক্রম শুরু হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সরকার। তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সঠিক নয়। বিষয়টি কর্তৃপক্ষ জানেন। তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। আমি কোনো ঘুষ বাণিজ্য বা সিন্ডিকেট পরিচালনার সঙ্গে জড়িত নই।”

সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. বদরুদ্দোজাও অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমার অফিসে কোনো ঘুষ বাণিজ্য হয় না। কেউ যদি আমার নাম ব্যবহার করে থাকে, সেটি তার ব্যক্তিগত বিষয়। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী অপরাধ করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমার অফিসে সংঘবদ্ধভাবে দুর্নীতি হয়—এ অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”

অভিযোগগুলো নিয়ে স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা যাচাই এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ