
আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে ব্যাংকটিতে প্রশাসনিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, সুশাসন লঙ্ঘন এবং নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক তদন্ত প্রতিবেদনে এসব অভিযোগের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে চেয়ারম্যানের পাশাপাশি পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অনিয়মে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে এবং একই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর মো. মেহমুদ হোসেনকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। তবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ব্যাংকটিতে অনিয়ম কমার পরিবর্তে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ও সুশাসনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধান ও নীতি বিভাগের (বিআরপিডি) নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো চেয়ারম্যান বা পরিচালক ব্যাংকের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ করতে পারেন না। কিন্তু তদন্তে দেখা গেছে, চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ৩৮ কার্যদিবসের মধ্যে ২২ দিন বিভিন্ন শাখা পরিদর্শন করে বড় করপোরেট গ্রাহকদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেছেন, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার পরিপন্থী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তে আরও বলা হয়েছে, বিতর্কিত ঋণসংক্রান্ত তদন্ত কমিটি এবং বিভিন্ন নিয়োগ বোর্ডে অংশ নিয়ে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা অতিরিক্ত সম্মানী গ্রহণ করেছেন। শুধু দুটি খাতেই অতিরিক্ত ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা সম্মানী প্রদান করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এছাড়া চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেন, সরকার মনোনীত পরিচালক মো. গোলাম মোস্তফা, স্বতন্ত্র পরিচালক কাজী মো. মাহবুব কাশেম এবং সরকার মনোনীত পরিচালক মো. মঞ্জুরুল হক ব্যাংকের ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে প্রত্যেকে ১৭ হাজার ২৫০ টাকা করে সম্মানী নিয়েছেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দায়িত্ব গ্রহণের পর চেয়ারম্যান ব্যাংকের সব শাখা ও উপশাখায় নিজের ছবি ও বাণী প্রদর্শনের নির্দেশ দেন, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে তদন্তকারী দল মন্তব্য করেছে।
বোর্ড সভা আয়োজনেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিয়ম অনুযায়ী মাসে একটি সাধারণ বোর্ড সভা হওয়ার কথা থাকলেও প্রতি মাসে চার থেকে পাঁচটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সাব-কমিটি, প্রশিক্ষণ এবং তদন্ত কমিটির সভার নামে অতিরিক্ত সম্মানী প্রদান করা হয়েছে। তদন্তে দেখা যায়, অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির মাত্র ছয়টি সভার জন্যই পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা ৫ লাখ ২০ হাজার টাকা অতিরিক্ত সম্মানী গ্রহণ করেছেন।
বিদেশ সফরের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকের মূল ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা ব্যাংকের অর্থে বিদেশ সফর করেছেন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান আইএফআইসি মানি ট্রান্সফার (ইউকে) লিমিটেডকে কেন্দ্র করে বোর্ড সভা, বিমান ভাড়া, হোটেল ও ভাতা বাবদ কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ের তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি ২০১১ সালে কার্যক্রম শুরু করলেও এখন পর্যন্ত কোনো লভ্যাংশ দেশে আনতে পারেনি।
নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও একাধিক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত অনুযায়ী, ঋণ পুনরুদ্ধার বিষয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও শেখ আখতার উদ্দিন আহমেদকে হেড অব রিকভারি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এছাড়া মো. মুজাহিদ কবিরের নিয়োগে পূর্ববর্তী প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্রের নথি পাওয়া যায়নি এবং হেড অব কার্ডস অ্যান্ড ডিজিটাল ব্যাংকিং পদে মো. জাকির হোসেনের নিয়োগে নির্ধারিত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও বয়সসীমা অনুসরণ করা হয়নি।
তদন্তে আরও বলা হয়েছে, চেয়ারম্যান তার পূর্ববর্তী কর্মস্থলের কয়েকজন কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়েছেন। পাশাপাশি এক্সিম ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংক থেকে বরখাস্ত বা অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্ত কয়েকজনকেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গত ২৩ জুলাই চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত শেষে আইএফআইসি ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ বন্ধ, ব্যাংকের শাখাগুলো থেকে চেয়ারম্যানের ছবি ও ব্যক্তিগত প্রচারসামগ্রী অপসারণ, অতিরিক্ত নেওয়া সম্মানী ব্যাংকের তহবিলে ফেরত দেওয়া এবং বিতর্কিত নিয়োগগুলোর পুনর্মূল্যায়নের সুপারিশ করেছে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আইএফআইসি ব্যাংকের মোট শেয়ার সংখ্যা ১৯২ কোটি ২০ লাখ ৮৬ হাজার ৬৪৭টি। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির উল্লেখযোগ্য অংশের মালিক অর্থ মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারী। টানা দুই বছর লোকসানে থাকা ব্যাংকটি ২০২৫ সালে ২ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা নিট লোকসান করেছে।
অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের স্থিতিশীলতা ও গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখতে সুশাসন, জবাবদিহি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করা জরুরি। তাদের মতে, তদন্তে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ব্যাংকিং খাতের প্রতি আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

