বৃহস্পতিবার, জুলাই ৩০, ২০২৬

বাডাস ও বারডেমে অ’নিয়মের অ’ভিযোগ, আলোচনায় মহাসচিব সাইফ উদ্দিন

দেশের ডায়াবেটিস চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি (বাডাস) ও বারডেম হাসপাতালের কার্যক্রম ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং আর্থিক অব্যবস্থাপনার একাধিক অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন গত ১৭ বছর ধরে বাডাসের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মো. সাইফ উদ্দিন।

সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের সময় রাজধানীর উত্তরার রাজলক্ষ্মী এলাকার ২ নম্বর সড়কে পাঁচ কাঠা জমির ওপর একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন সাইফ উদ্দিন। এছাড়া গুলশানের প্রিন্স সিটিতে তার দুটি বাণিজ্যিক দোকান রয়েছে। দামি গাড়ি ব্যবহার এবং স্ত্রী ও স্বজনদের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে সাইফ উদ্দিন বলেন, তিনি সরকারের সচিব এবং ইসলামী ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। উত্তরার বাড়িসহ তার সব সম্পদ বৈধ আয়ে অর্জিত। তিনি আরও জানান, বর্তমানে তার বয়স ৮০ বছর এবং গত ১৭ বছর ধরে তিনি বাডাসে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

অনুদান ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ

বাডাস প্রতি বছর সরকারের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা, জাকাত তহবিল এবং ব্যক্তিগত দাতাদের কাছ থেকে অনুদান পেয়ে থাকে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিষ্ঠানটি ২৮ কোটি টাকা অনুদান পেয়েছে। এর মধ্যে বেতন বাবদ ৫ কোটি ৬০ লাখ এবং পণ্য ও সেবা খাতে ২২ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব অর্থের একটি অংশ মনগড়া অডিটের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুন মাসে বারডেম জেনারেল হাসপাতালের হিসাব পর্যালোচনায় দেখা যায়, রিএজেন্ট, ভোগ্যপণ্য ও অন্যান্য সামগ্রী খাতে এক মাসেই ১৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে, যা আগের ১১ মাসের গড় ব্যয়ের তিন গুণেরও বেশি। তদন্তে এ ব্যয়ের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ।

এ বিষয়ে সাইফ উদ্দিন বলেন, তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং কয়েকজনের চাকরিও বাতিল করা হয়েছে।

স্বজনপ্রীতি ও পারিবারিক প্রভাবের অভিযোগ

বাডাসের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, বদলি এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে স্বজনপ্রীতির অভিযোগও উঠেছে মহাসচিবের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, তার মামা, ভাই, দ্বিতীয় স্ত্রীর আত্মীয়সহ পরিবারের একাধিক সদস্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর সুপারিশেও একাধিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কর্মকর্তাদের অভিযোগ, অনিয়মের প্রতিবাদ করলে বদলি, পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা কিংবা চাকরি হারানোর মতো ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এক কর্মকর্তা দাবি করেন, সাইফ উদ্দিন ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম. এ. সামাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলায় তিনি পদোন্নতি পাননি।

প্রকল্পের অর্থ স্থানান্তর নিয়ে বিতর্ক

অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর একটি প্রকল্পের ৫৮ লাখ টাকা সাময়িক ঋণ হিসেবে অন্য একটি প্রকল্পে স্থানান্তর করা হয়, যা দাতা সংস্থার নীতিমালা ও অডিট বিধির পরিপন্থী।

তবে সাইফ উদ্দিন এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এক প্রকল্পের অর্থ অন্য প্রকল্পে স্থানান্তরের সুযোগ নেই এবং বাডাসের সব হিসাব সরকারি অডিটের আওতায় রয়েছে।

প্রকল্প ব্যয় ও ঋণ বিতরণ নিয়ে প্রশ্ন

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পের মেয়াদ শেষে অব্যবহৃত অর্থ ফেরত এড়াতে তড়িঘড়ি করে বেতন বৃদ্ধি, পদোন্নতি এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ব্যক্তিগত বিদেশ সফরের জন্য প্রকল্প তহবিল থেকে ঋণ এবং ব্যক্তিগত ফ্ল্যাট কেনার উদ্দেশ্যে বাডাসের তহবিল থেকে ১০ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।

কর্মচারী ছাঁটাই ও বিচারাধীন মামলা

বারডেম পরিচালিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ সায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতাল (বিআইএইচএস)-এর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের কর্মচারীদের বেআইনিভাবে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগে আদালতে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, কোনো নোটিশ বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই তাদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

আর্থিক সংকটের অভিযোগ

অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত আর্থিক অবস্থা গোপন রেখে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংক ও বিভিন্ন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে বাডাসের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা দেনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

এ বিষয়ে সাইফ উদ্দিন বলেন, সরকারি অনুদান মূলত বারডেম হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ হয়। হাসপাতালের ৩০ শতাংশ শয্যা দরিদ্র রোগীদের জন্য বিনামূল্যে রাখা হয় এবং তাদের ইনসুলিন ও ওষুধও বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়। তার দাবি, গত বছর বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিতে বাডাস ১১৩ কোটি টাকা ব্যয় করেছে।

বিশেষজ্ঞের মতামত

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কোনো লোকসানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যদি বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে থাকেন, তবে সেখানে অনিয়ম বা দুর্নীতির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বৈধ আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য এবং প্রতিষ্ঠানকে লোকসানি দেখানোর পেছনে কোনো অনিয়ম বা প্রতারণা রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা উচিত। পাশাপাশি স্বাধীন ও তালিকাভুক্ত অডিট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিরপেক্ষ অডিট করে তার ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশেরও সুপারিশ করেন তিনি।

তবে প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সাইফ উদ্দিন তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তার সব সম্পদ বৈধ আয়ে অর্জিত এবং বাডাসের আর্থিক কার্যক্রম নিয়মিত অডিটের আওতায় রয়েছে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ