
মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তরিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে কমিশন বাণিজ্য, ঠিকাদারদের কাছ থেকে বিভিন্ন স্তরে অর্থ আদায়, নিম্নমানের কাজের বিল পরিশোধ এবং সরকারি বরাদ্দের অর্থ অপব্যবহারের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, তিনি প্রকাশ্যে ঘুষ গ্রহণ না করলেও অধীনস্থ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থায় কমিশন আদায় করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, কাজের কার্যাদেশ থেকে শুরু করে বিলের চেক গ্রহণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই ঠিকাদারদের নির্ধারিত হারে অর্থ দিতে বাধ্য করা হয়।
দুই মাস ধরে পরিচালিত সরেজমিন অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট বিভাগে এমন অভিযোগের পক্ষে বিভিন্ন তথ্য ও বক্তব্য পাওয়া গেছে। ঠিকাদার পরিচয়ে যোগাযোগ করা হলে বিভাগের দুই উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) কাজের বিনিময়ে নির্ধারিত হারে অর্থ দেওয়ার কথা বলেন। তাদের দাবি, হিসাব অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করলে বিল নির্ধারিত সময়েই পাওয়া যাবে। অভিযোগ রয়েছে, এভাবে চুক্তিমূল্যের ৫৭ থেকে ৬০ শতাংশ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারও বেশি অর্থ আদায় করা হয়। ওই অর্থের একটি অংশ নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তরিকুল ইসলামের কাছেও পৌঁছে যায় বলে সংশ্লিষ্ট দুই এসডিই প্রতিনিধির কাছে দাবি করেন।
ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের অভিযোগ, নির্বাহী প্রকৌশলী তরিকুল ইসলাম প্রায়ই বলে থাকেন, টেন্ডার বা বিলের চেকের জন্য তাঁকে কোনো অর্থ দিতে হবে না। তবে বাস্তবে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের দাবি, কার্যাদেশ গ্রহণ, কাজ শুরু, বিল প্রস্তুত, পরিমাপ, অনুমোদন এবং চেক গ্রহণ—প্রতিটি ধাপেই নির্ধারিত হারে কমিশন দিতে হয়। কমিশনের অর্থ পরিশোধ না করলে বিভিন্ন অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হয় এবং ঠিকাদারদের এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ঘুরতে হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা (এপিপি) খাতের বিভিন্ন প্রকল্পে কাজের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উপসহকারী প্রকৌশলীরা অনেক সময় ঠিকাদারদের জানান, নির্ধারিত কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এরপর ক্যালকুলেটরের মাধ্যমে হিসাব করে চুক্তিমূল্যের বড় একটি অংশ কমিশন হিসেবে দাবি করা হয়। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এই অর্থ উপসহকারী প্রকৌশলী, এসডিই এবং নির্বাহী প্রকৌশলীর মধ্যে ভাগাভাগির পরই সংশ্লিষ্ট বিলে স্বাক্ষর করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগে আবাসিক খাতে ১২৩টি প্রকল্পে ৬ কোটি ২০ লাখ টাকা, অনাবাসিক খাতে ১০৫টি প্রকল্পে ৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ২১টি প্রকল্পে ৫ কোটি ২ লাখ ৯৭ হাজার টাকা এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা খাতে ১৪টি প্রকল্পে ২ কোটি ১৩ লাখ টাকাসহ প্রায় ২২ কোটি টাকার বরাদ্দ ছিল। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রকল্পের অনেক ক্ষেত্রে কাজ সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে বিল পরিশোধ করা হয়েছে। একই ধরনের অনিয়ম চলমান ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রকল্পগুলোতেও অব্যাহত রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, নির্বাহী প্রকৌশলীকে প্রয়োজনের সময় অফিসে পাওয়া যায় না। ফলে সাধারণ ঠিকাদাররা প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। তবে সিন্ডিকেটভুক্ত ঠিকাদারদের সঙ্গে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ জোন ভবন ও সার্কেল অফিসে নিয়মিত বৈঠক করে তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আরও অভিযোগ, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সকাল ১০টার মধ্যে অফিসে উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তিনি তা নিয়মিত অনুসরণ করেন না। অনুসন্ধানকালে টানা তিন দিন সকাল সাড়ে ৯টায় অফিসে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি সাইটে থাকার কথা জানান।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক-কান-গলা (ইএনটি) বিভাগের ৩০৩ নম্বর ওয়ার্ডের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে এক রোগী আহত হন। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের প্রশ্ন, প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয়ে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ পরিচালিত হওয়ার পরও কীভাবে হাসপাতালের ছাদ ও দেয়ালের অংশ ভেঙে পড়ে। তাদের দাবি, বছরের বিভিন্ন সময়ে ভবনের বিভিন্ন অংশ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ে রোগী, চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন মেরামত ও সংস্কার প্রকল্পে ৫ কোটি ২ লাখ ৯৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই বরাদ্দের আওতায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, হাসপাতাল-২, ইন্টার্নি ছাত্র হোস্টেল, স্টাফ কোয়ার্টার, জরুরি বিভাগ, সিসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, ওপিডি ভবন, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, টয়লেট, স্যুয়ারেজ লাইনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নের নামে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। পাশাপাশি স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিভিন্ন ভবনের সংস্কার ও আধুনিকায়নেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসব প্রকল্পের অনেকগুলোতেই ব্যাপক অনিয়ম, নিম্নমানের কাজ এবং জালিয়াতির মাধ্যমে বরাদ্দের বড় অংশ আত্মসাৎ করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাঠ কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, ম্যানুয়াল কোটেশনের মাধ্যমেও প্রায় দেড় কোটি টাকার সরকারি অর্থ অপচয় বা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। একইভাবে সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের ফিনিশিং কাজেও অনিয়মের অভিযোগ করেছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। তাদের দাবি, জুন মাসে অগ্রিম বিল পরিশোধের পরও অতিরিক্ত ৩ থেকে ৪ শতাংশ হারে কমিশন আদায় করা হয়েছে।

