
কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামে আসার পথে এক পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে উদ্ধার করা এক লাখ পিস ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগের সত্যতা তদন্তে পাওয়া গেলেও এ ঘটনায় দায়ী হিসেবে অভিযুক্ত থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) বিরুদ্ধে এখনো কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও আত্মসাৎ হওয়া ইয়াবা উদ্ধার হয়নি এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ফৌজদারি মামলাও হয়নি।
সর্বশেষ গত ৯ জুন বাকলিয়া থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এর আগে একই ঘটনায় এসআই মো. আল-আমিন সরকার, এসআই মো. আমির হোসেন, এএসআই সাইফুল আলম, এএসআই জিয়াউর রহমান, এএসআই সাদ্দাম হোসেন, এএসআই এনামুল হক, কনস্টেবল রাশেদুল হাসান এবং কনস্টেবল উম্মে হাবিবা স্বপ্নাকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
এছাড়া ইয়াবাসহ আটক হওয়া কক্সবাজার জেলা আদালতের বিচারকের গানম্যান কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
তদন্তে যা উঠে এসেছে
ছয় পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেন কক্সবাজারের মোশাররফ নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে এক লাখ পিস ইয়াবাভর্তি একটি লাগেজ নিয়ে ঢাকাগামী একটি বাসে ওঠেন। বাসটি কর্ণফুলী নদীর শাহ আমানত সেতু অতিক্রম করার পর বাকলিয়া থানার এএসআই সাদ্দাম হোসেন ও পুলিশের এক সোর্স বাসে তল্লাশি চালান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইমতিয়াজ নিজেকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দিলেও তাকে বাস থেকে নামিয়ে একটি পুলিশ বক্সে নেওয়া হয়। একই সময়ে বাসের সুপারভাইজারকে দ্রুত বাসটি ছেড়ে দিতে বলা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে ইমতিয়াজ দাবি করেন, পুলিশ বক্সে বাকলিয়া থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদ এবং এসআই আল-আমিন সরকার উপস্থিত ছিলেন। সেখানে লাগেজ খুলে ১০টি প্যাকেটে থাকা মোট এক লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। পরে ইয়াবাগুলো নিজেদের হেফাজতে রেখে খালি লাগেজসহ ইমতিয়াজকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওসির নির্দেশে ইয়াবা গায়েবের অভিযোগ
তদন্ত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাকলিয়া থানার তৎকালীন ওসি আফতাব উদ্দিনের সরাসরি নির্দেশেই উদ্ধার হওয়া ইয়াবা গায়েব করা এবং আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৪৬ ধারা অনুযায়ী মাদকসংক্রান্ত অপরাধ আমলযোগ্য হলেও সংশ্লিষ্ট ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়নি। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশ প্রবিধান (পিআরবি) এবং পুলিশ আইনের প্রাসঙ্গিক বিধান লঙ্ঘিত হয়েছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ না করা বা তা ধ্বংস করার অভিযোগও আনা হয়েছে, যা তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ওসির বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তৎকালীন ওসি আফতাব উদ্দিন বলেন, “ইয়াবার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমি কোনো ইয়াবা আত্মসাৎ করিনি। ঘটনার সময় আমি বাসায় ছিলাম।”
কেন ব্যবস্থা হয়নি?
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কনস্টেবল থেকে উপপরিদর্শক (এসআই) পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের সাময়িক বরখাস্ত করার ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট পুলিশ কমিশনারের থাকলেও পরিদর্শক (ইনস্পেক্টর) এবং ওসি পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশ সদর দপ্তরের অনুমোদন প্রয়োজন হয়।
এ কারণেই বাকলিয়া থানার তৎকালীন ওসির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি এখনো পুলিশ সদর দপ্তরের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তদন্ত কমিটির সুপারিশ
তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত উপকমিশনার (পশ্চিম) আবদুল্লাহ মোহাম্মদ শেখ সাদী জানিয়েছেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় আটজন পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্তের সুপারিশ করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তা কার্যকর করা হয়।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা, ফৌজদারি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিয়মিত মামলা দায়েরের সুপারিশও তদন্ত প্রতিবেদনে করা হয়েছে। পাশাপাশি বাকলিয়া থানার তৎকালীন ওসি ও পরিদর্শক (তদন্ত)-এর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থানের কথা বললেন পুলিশ কমিশনার
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের নবনিযুক্ত কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, “এক লাখ পিস ইয়াবা গায়েবের ঘটনায় এতদিন কেন নিয়মিত মামলা হয়নি, সেটি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
এদিকে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা উঠে আসার পরও মূল অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলায় বিষয়টি নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে পুলিশের জবাবদিহিতা ও জনআস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।

