
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) অধীন আধুনিক সার গুদাম নির্মাণ এবং পুরোনো গুদামগুলোর সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রকল্পের বরাদ্দের একটি বড় অংশ বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে অপচয় ও আত্মসাৎ করা হয়েছে, যার ফলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রকল্প বাস্তবায়নে আর্থিক অনিয়ম, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি এবং কাজ সম্পূর্ণ শেষ না করেই অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপে নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, কৃষিতে সার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ২০১৯ সালে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় এবং চলতি বছরের জুনে এর মেয়াদ শেষ হয়। প্রকল্পের আওতায় দেশের ২১টি জেলায় নতুন সার গুদাম নির্মাণ এবং পুরোনো গুদাম সংস্কারের কাজ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৩৫০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, নতুন গুদাম ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় মাটি পরীক্ষা, পাইল লোড টেস্টসহ গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি পরীক্ষাগুলো যথাযথভাবে সম্পন্ন করা হয়নি। এছাড়া সিডিউলের বাইরে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। এতে ভবনগুলোর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে রংপুরের আলমনগর এলাকায় নির্মিত একটি সার গুদামে গিয়ে দেখা যায়, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও ভবনটির বৈদ্যুতিক সংযোগের কাজ চলছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজের শুরু থেকেই পর্যাপ্ত তদারকি ছিল না এবং ভবনের ভিত্তি নির্মাণে প্রয়োজনীয় মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।
দিনাজপুরের বিরামপুর এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, ৭ হাজার ২০০ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার গুদাম ভবনটির নির্মাণকাজে শুরু থেকেই নানা অনিয়ম হয়েছে। তাদের দাবি, পাইলিংয়ের পর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে ভবনের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএডিসির একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, নির্মাণকাজে ব্যবহৃত উপকরণের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে সাইট তদারকিও ছিল দুর্বল। তাদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করেই কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে কাগজে-কলমে কাজ দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের ঘটনাও ঘটেছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, দৃষ্টিনন্দন নকশা ও ব্যয়বহুল উপকরণের অজুহাতে প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছে। এর পেছনে আর্থিক অনিয়মের উদ্দেশ্য ছিল বলে তারা দাবি করেন। তারা এ প্রকল্পে ব্যয়, নির্মাণমান এবং সংস্কার কার্যক্রমের বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাধারণ কর্মকর্তারা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের মতে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে।
অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মুজিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, প্রকল্পের শতভাগ কাজ শেষ না হলেও মেয়াদ বাড়ানোর জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। তবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এমন কোনো আবেদন তাদের জানা নেই। আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।

