
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী মো. আব্দুল আউয়ালের বিরুদ্ধে ঠিকাদারি ব্যবসায় পরোক্ষ সম্পৃক্ততা, গোপন টেন্ডার বাণিজ্য, পদোন্নতিতে অনিয়ম এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তিনি সরাসরি ঠিকাদারি ব্যবসায় জড়িত না থাকলেও কথিত এক ‘ভাতিজা’ ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মাধ্যমে দরপত্র, প্রকল্প অনুমোদন এবং বিল উত্তোলনসহ বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন। অভিযোগের মধ্যেই গত বছরের ১৭ নভেম্বর জ্যেষ্ঠতা তালিকায় তার আগে থাকা অন্তত ২৬ জন কর্মকর্তাকে অতিক্রম করে তাকে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, শীর্ষ পর্যায়ের প্রভাবের কারণেই এ ধরনের কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে।
অধিদপ্তরের নথি অনুযায়ী, মো. আব্দুল আউয়াল ১৯৯৮ সালের ৫ মার্চ একটি প্রকল্পের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে যোগদান করেন। পরে ২০০৬ সালে রাজস্ব খাতে আত্মীকৃত হন এবং ২০১৩ সালে নিয়মিত চাকরিতে অন্তর্ভুক্ত হন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতা উপেক্ষা করে পদায়নের ফলে টেন্ডার অনুমোদন, বিল উত্তোলন, তহবিল ছাড়, পদায়ন ও পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তাদের দাবি, ওই সিন্ডিকেটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা।
অভিযোগ রয়েছে, হুমায়ুন কবীর নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে নূর ট্রেডার্সসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ময়মনসিংহের ফুলপুরসহ একাধিক এলাকায় প্রকল্পের কাজ পরিচালিত হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, কাগজে-কলমে ঠিকাদার ভিন্ন ব্যক্তি হলেও দরপত্র প্রস্তুত, কাজের অনুমোদন এবং বিল উত্তোলনের পুরো প্রক্রিয়ায় মো. আব্দুল আউয়ালের প্রভাব রয়েছে।
এছাড়া ময়মনসিংহে দায়িত্ব পালনকালে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলির ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং পেনশন ও পিআরএলের কাগজপত্র অনুমোদনের ক্ষেত্রে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মো. আব্দুল আউয়ালের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগ অনুযায়ী, নরসিংদীতে নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এছাড়া এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত নরসিংদী পৌরসভার সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়ম এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় পৃথকভাবে তদন্তেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়। নরসিংদী ও কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন প্রকল্পে দরপত্র প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের অভিযোগে অডিট আপত্তিও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
ময়মনসিংহ সদর উপজেলার গ্রামীণ পানি সরবরাহ উন্নয়ন প্রকল্প, ত্রিশাল উপজেলার স্যানিটেশন প্রকল্প এবং গৌরীপুর পৌরসভার পানি সরবরাহ প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও অনেক এলাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা যায়নি।
এদিকে নোয়াখালীতে ডানিডা অর্থায়নে বাস্তবায়িত একটি প্রকল্পের প্রায় ৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকার পাইপ ও নির্মাণসামগ্রী মাত্র ১৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় গোপন নিলামের মাধ্যমে বিক্রির অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, অধিকাংশ ঠিকাদার নিলামের বিষয়ে অবগত না থাকায় প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের সুযোগ তৈরি হয়নি। পরে এসব মালামাল মেসার্স শাহনাজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা হয়। তবে নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, নিলাম প্রক্রিয়া ঢাকা থেকে পরিচালিত হয়েছে এবং তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনো নিলাম পরিচালনা করেননি।
একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকল্পের কাজ পেতে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হয় এবং কিছু প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। যদিও নূর ট্রেডার্স-সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, তারা নিয়ম মেনেই কাজ পরিচালনা করছেন।
এছাড়া বিপুল অর্থের বিনিময়ে পছন্দের কর্মকর্তাদের নিয়মবহির্ভূতভাবে পদোন্নতি দেওয়ার চেষ্টা এবং বেতন-গ্রেড নির্ধারণে অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, টেন্ডার প্রক্রিয়া, প্রকল্প বাস্তবায়ন, পদোন্নতি এবং নোয়াখালীর নিলামসহ উত্থাপিত অভিযোগগুলো যথাযথভাবে তদন্ত করা হলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে।

