সোমবার, জুন ১৫, ২০২৬

৭ বছরে শতকোটি টাকার সম্পদ! রাজউকের ইমারত পরিদর্শক মনিরুজ্জামানকে ঘিরে বি’স্ফোরক অ’ভিযোগ, তদন্তে দুদক

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ইমারত পরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ভবন মালিকদের হয়রানির মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র ও অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১০ম গ্রেডের একজন কর্মকর্তা হিসেবে ২০১৮ সালে চাকরিতে যোগদানের পর মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর উত্তরা, মিরপুর, মহাখালী, বাংলামটরসহ বিভিন্ন এলাকায় মনিরুজ্জামান ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক ফ্ল্যাট, জমি এবং অন্যান্য সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে উত্তরা সেক্টর-১৭-এর রয়েল টাওয়ারে একটি ১,৫০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট, একই এলাকায় পলিয়ানথাস সেতু প্রকল্পে আরেকটি ফ্ল্যাট, তুরাগের বাদলদি হাইটসে একটি ফ্ল্যাট, মিরপুরের পীরেরবাগ এলাকায় একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং মহাখালীর ফলকন টাওয়ারে একটি ফ্ল্যাটের মালিকানা রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ছাড়া গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের বাউপাড়া মৌজায় প্রায় ২৫০ শতাংশ জমির মালিকানার তথ্য পাওয়া গেছে, যার বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। নিজ জেলা পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় তার, তার স্ত্রী এবং স্বজনদের নামে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি ও সম্পদ থাকার অভিযোগও উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, মনিরুজ্জামানের স্ত্রী কানিজ জাহানের নামে বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় কয়েক কোটি টাকা মূল্যের জমি রয়েছে। ওই জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়ার পর নির্মাণকাজও শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে রাজধানীর বাংলামটর এলাকার একটি বহুতল ভবনে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে বর্তমানে মনিরুজ্জামান বসবাস করছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি চাকরিতে স্বল্প সময়ের মধ্যে তার নামে ও বেনামে গড়ে ওঠা সম্পদের পরিমাণ কয়েক কোটি টাকারও বেশি।

একাধিক সূত্রের অভিযোগ, দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন ভবন মালিককে নোটিশ প্রদানকে কেন্দ্র করে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, নোটিশ প্রত্যাহার বা প্রশাসনিক জটিলতা এড়ানোর আশ্বাস দিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ দাবি করা হতো। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মনিরুজ্জামানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রাজউকের বিভিন্ন জোনে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ বহুবার উঠেছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে। অতীতে গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকলেও সেসব বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করেও তিনি বিভিন্ন সময়ে প্রভাব বিস্তার করেছেন। তবে এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে রাজউকের ১৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে চলমান অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে সহকারী পরিচালক মো. নুর আলম সিদ্দিকীকে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, তার বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক অভিযোগপত্র জমা পড়েছে। একই সঙ্গে রাজউকের প্রশাসন বিভাগ থেকেও অভিযোগগুলো যাচাই করতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাজউকের অবস্থান স্পষ্ট। দুদক অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে চার্জশিট দিলে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে আমরা এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছাইনি।”

তিনি আরও বলেন, “অভিযোগ যে কারও বিরুদ্ধে থাকতে পারে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। অনেক সময় ব্যক্তিগত বিরোধ থেকেও অভিযোগ উত্থাপিত হয়।”

দুদক সূত্র জানিয়েছে, তদন্ত বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সম্পদের উৎস, ক্রয়মূল্য, ব্যাংক হিসাব, আর্থিক লেনদেন, ভূমি রেকর্ড এবং মালিকানা সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, উত্তরা, মিরপুর ও মহাখালী এলাকার কয়েকজন ভবন মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, নোটিশ সংক্রান্ত বিষয়ে তাদের ওপর বিভিন্ন ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হতো। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং দায় নির্ধারণের জন্য তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করতে হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন সরকারি কর্মকর্তা স্বল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন—এমন অভিযোগ যদি তদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে তা কেবল ব্যক্তিগত অনিয়ম নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও সুশাসনের প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসবে। এখন দুদকের চলমান তদন্তই নির্ধারণ করবে অভিযোগগুলোর বাস্তবতা কতটুকু।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ