সোমবার, জুন ১৫, ২০২৬

কর্মীদের নামে ৫৬৭ কোটি টাকার ঋণ, বিদেশে আদনান ইমাম: বেনামি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে বড় কেলেঙ্কারির অ’ভিযোগ

পাচার ও ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে আলোচনায় আদনান ইমাম, কর্মীদের ঘাড়ে ৫৬৭ কোটি টাকার ঋণের বোঝা

লন্ডনভিত্তিক ব্যবসায়ী ও এনআরবিসি ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পর্ষদের চেয়ারম্যান আদনান ইমামের বিরুদ্ধে বেনামি প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে শত শত কোটি টাকার ঋণ উত্তোলন, অর্থ পাচার এবং কর্মীদের নামে ঋণের দায় চাপিয়ে বিদেশে চলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এনআরবিসি ব্যাংক ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) থেকে প্রায় ৫৬৭ কোটি টাকার বেশি ঋণ উত্তোলন করা হয়েছে, যার দায় এখন বহন করছেন কয়েকজন সাধারণ কর্মচারী।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, লন্ডনভিত্তিক আবাসন প্রতিষ্ঠান আইপিই (ইমাম অ্যান্ড পাটোয়ারি ইকুইটি) গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আদনান ইমাম এবং চেয়ারম্যান তার বাবা চৌধুরী ফজলে ইমাম। ব্রিটিশ ও বাংলাদেশি নাগরিক আদনান ইমামের নিয়ন্ত্রণে দেশে-বিদেশে প্রায় ২০টি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম রয়েছে বলে জানা গেছে, যার মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও পরিচালনা কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠান ইক্সোরা অ্যাপারেলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান হিসেবে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী বদরুল হাসান পাটোয়ারিকে দায়িত্বে রাখা হলেও প্রতিষ্ঠানের মূল নিয়ন্ত্রণ ছিল আদনান ইমামের হাতেই। প্রতিষ্ঠানটির বিপরীতে এনআরবিসি ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়া হয়। তবে সরেজমিনে গাজীপুরের কাশিমপুরে অবস্থিত কারখানাটি বন্ধ অবস্থায় পাওয়া গেছে। এছাড়া বিজিএমইএর তথ্যেও প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখযোগ্য রপ্তানি কার্যক্রমের তথ্য পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তারা প্রতিষ্ঠানের সাধারণ বেতনভুক্ত কর্মচারী হলেও তাদের অজান্তে বিভিন্ন কোম্পানির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালক হিসেবে দেখিয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের ৬ অক্টোবর ব্যাংকের চিঠি পাওয়ার পর তারা প্রথম জানতে পারেন যে তাদের নামে এনআরবিসি ব্যাংকের উত্তরা শাখা থেকে ১২৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে।

পরবর্তীতে ঋণ পরিশোধের জন্য একাধিক নোটিশ পাঠানো হলে কর্মচারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এ ঘটনায় কয়েকজন ভুক্তভোগী আদালতের শরণাপন্ন হয়ে মামলা দায়ের করেছেন। তাদের দাবি, ঋণ গ্রহণের বিষয়ে তারা কিছুই জানতেন না এবং কোনো নথিপত্রেও স্বেচ্ছায় স্বাক্ষর করেননি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনআরবিসি ব্যাংকের উত্তরা শাখার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। শাখা ব্যবস্থাপক গোলাম মোহাম্মদকে সরাসরি পাওয়া না গেলেও তিনি ফোনে জানান, ঋণসংক্রান্ত বিষয়ে ব্যাংক ইতোমধ্যে ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

অন্যদিকে, রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ইউসিবি ব্যাংকের একটি শাখা থেকে ইউকে বাংলা এগ্রো ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ফুলপুর এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের কয়েকজন কর্মচারীর নামে প্রায় ৪৪৩ কোটি ১৩ লাখ টাকার ঋণ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সুদ-আসল মিলিয়ে এ ঋণের পরিমাণ বর্তমানে আরও বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে এটি শুধু একটি আর্থিক জালিয়াতির ঘটনা নয়, বরং বেনামি প্রতিষ্ঠান, পরিচয় জালিয়াতি, ঋণ অনিয়ম ও সম্ভাব্য অর্থ পাচারের বড় ধরনের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হবে। বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের অনুসন্ধান ও আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

অভিযোগের সত্যতা, ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তবে কর্মচারীদের নামে শত শত কোটি টাকার ঋণের দায় চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ইতোমধ্যেই ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ