শনিবার, জুন ১৩, ২০২৬

চেয়ার নেই, চাকরি নেই—তবু তারাই বস! ঢাকার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কারা এই উমেদার?

চাকরি নেই, সরকারি বেতন নেই, এমনকি অফিসে নির্দিষ্ট কোনো চেয়ার-টেবিলও নেই। অথচ তাদের ইশারাতেই চলছে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ঢাকা তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের ১১টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ‘উমেদার’ নামে পরিচিত একদল অনানুষ্ঠানিক কর্মীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিশাল ঘুষ ও প্রভাবের সিন্ডিকেট—এমন অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দলিল নিবন্ধনের প্রায় প্রতিটি ধাপেই এই উমেদারদের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ লেনদেন হয়। অভিযোগ রয়েছে, দলিলের সামান্য ভুল, বানান বা কাগজপত্রের ত্রুটি দেখিয়ে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের ফাইল আটকে রাখা হয়, পরে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে তা দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়।

দৈনিক কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ

সূত্রগুলো বলছে, ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের ১১টি অফিসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত অবৈধ ঘুষ লেনদেন হতে পারে। মাসিক হিসেবে যার পরিমাণ ২০ থেকে ২২ কোটি টাকা এবং বার্ষিক হিসাবে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে এসব তথ্যের কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, সাব-রেজিস্ট্রাররা সরাসরি অর্থ গ্রহণ না করে তাদের ঘনিষ্ঠ উমেদারদের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করেন। এই উমেদাররাই মূলত ‘ক্যাশ কালেক্টর’ ও তদারককারীর ভূমিকা পালন করে।

‘উমেদার’ কারা?

‘উমেদার’ শব্দটি ফারসি ভাষা থেকে এসেছে, যার অর্থ চাকরি-প্রত্যাশী ব্যক্তি। মুঘল ও ব্রিটিশ আমলে প্রশিক্ষণ বা কাজ শেখার উদ্দেশ্যে এই ধরনের ব্যবস্থা চালু থাকলেও বর্তমানে তারা কোনো সরকারি কাঠামোর অংশ নন। তবুও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে তাদের ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

কিছুদিন আগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কোটিপতি উমেদারদের একটি তালিকা তৈরি করেছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে পরে সেই ফাইল রহস্যজনকভাবে হারিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি একটি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে ৪২ জন প্রভাবশালী উমেদারের তালিকা উঠে এসেছে বলেও জানা গেছে।

কোন অফিসে কী অভিযোগ?

মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস

এখানে উমেদারদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, প্রভাব বিস্তার ও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন উমেদারের বিরুদ্ধে মাদক ও চাঁদাবাজির মামলার অভিযোগও আছে। স্থানীয়দের দাবি, অফিসটি কার্যত একটি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলছে।

খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিস

এখানে দৈনিক বিপুল পরিমাণ ঘুষ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজন প্রভাবশালী উমেদার খাসকামরা ও রেকর্ডরুম নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে।

ঢাকা সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস

অভিযোগ রয়েছে, এখানে এক উমেদার কার্যত ‘প্রক্সি সাব-রেজিস্ট্রার’ হিসেবে কাজ করেন। ফাইল আটকে গেলে তিনি সরাসরি দাতা-গ্রহীতার সঙ্গে ঘুষের সমঝোতা করেন বলে অভিযোগ।

উত্তরা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস

এই অফিসে ঘুষের টেবিল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন উমেদার গোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টার কথাও জানা গেছে।

পল্লবী ও ধানমন্ডি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস

পল্লবীতে এক উমেদারের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা থাকা সত্ত্বেও তার প্রভাব অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ। ধানমন্ডিতে উচ্চমূল্যের প্লট ও ফ্ল্যাট নিবন্ধনের কারণে বড় অঙ্কের ঘুষ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

বাড্ডা ও গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিস

বাড্ডায় দৈনিক নির্দিষ্ট অঙ্কের ঘুষ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। গুলশানে ধনাঢ্য গ্রাহকদের টার্গেট করে বড় অঙ্কের অবৈধ অর্থ আদায় করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

প্রবীণ দলিল লেখক আলী হোসেন মাতবর বলেন, “বর্তমানে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোর নিয়ন্ত্রণ কার্যত উমেদারদের হাতে চলে গেছে। নির্দিষ্ট হারে অর্থ না দিলে দলিল নিবন্ধন প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ে।”

ভূমি আইন বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইমতিয়াজ কবির বলেন, “উমেদারদের কোনো সরকারি জবাবদিহিতা নেই। আইন অনুযায়ী এজলাসের সামনে যাওয়ার অধিকার না থাকলেও তারা খাসকামরা ও রেকর্ড রুমে প্রভাব বিস্তার করছে। এটি পুরো নিবন্ধন ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।”

কর্তৃপক্ষ কী বলছে?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, উমেদারদের নিয়োগের কোনো সুস্পষ্ট বিধিমালা নেই এবং তারা অনানুষ্ঠানিকভাবে কাজ করছেন। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলেও দাবি করেন তারা। তবে লোকবল সংকট ও কিছু সাব-রেজিস্ট্রারের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণে তাদের পুরোপুরি সরানো যাচ্ছে না বলে স্বীকার করেন।

তদন্তের দাবি

সচেতন নাগরিক ও দুর্নীতিবিরোধী সংগঠনগুলোর দাবি, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে উমেদারদের ভূমিকা, অবৈধ অর্থ লেনদেন এবং সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। তাদের মতে, এভাবে চলতে থাকলে শুধু সরকারের রাজস্ব ক্ষতিই নয়, ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ