
খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কামরুল হাসানকে ঘিরে দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে স্থানীয় ঠিকাদার, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সচেতন মহলে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, গোপালগঞ্জ থেকে খুলনায় বদলি হয়ে আসার পর থেকেই বিভাগটির বিভিন্ন কার্যক্রমে তার প্রভাব ও সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সরকারি ক্রয়বিধি ও প্রশাসনিক নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, দরপত্র প্রক্রিয়া এবং ঠিকাদারি ব্যবস্থাপনায় একক প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে। এতে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
নিলাম দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগ
অভিযোগের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১-এর আওতাধীন সিএন্ডবি কলোনি ও জোড়া গেট এলাকার সরকারি ভবন বিক্রির নিলাম কার্যক্রম। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর-২০০৮) অনুসরণে যথাযথ স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়নি এবং কিছু নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দিতে দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানো হয়েছে।
তাদের দাবি, দরপত্রের শর্ত নির্ধারণ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব থাকায় সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব আয় থেকেও বঞ্চিত হতে পারে।
‘হিডেন টেন্ডার’ ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ
স্থানীয় ঠিকাদারদের একটি অংশের অভিযোগ, বিভাগটিতে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে, যারা তথাকথিত ‘হিডেন টেন্ডার’ বা গোপন দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেয়।
এছাড়া আত্মীয়-স্বজনদের নামে ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবহার করে প্রকল্প বণ্টনের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের মতে, এর ফলে যোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক ঠিকাদারেরা কাজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের গুণগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ফাইল আটকে ঘুষ আদায়ের অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার ও কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, প্রাক্কলন অনুমোদন, দরপত্র যাচাই এবং টেন্ডার ইভ্যালুয়েশন কমিটির (টিইসি) বিভিন্ন ধাপে অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেন ছাড়া ফাইল অগ্রসর হয় না।
তাদের দাবি, নির্ধারিত অর্থ প্রদান না করলে ফাইল আটকে রাখা, অতিরিক্ত জটিলতা সৃষ্টি এবং বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগ করা হয়, যা সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করছে।
অতীত কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, কামরুল হাসানের পূর্ববর্তী কর্মস্থল গোপালগঞ্জেও একটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি একপর্যায়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নজরদারিতে এলেও তা আর দৃশ্যমান অগ্রগতি পায়নি।
এছাড়া বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
তদন্তের দাবি
স্থানীয় সচেতন নাগরিক, ঠিকাদার ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তাদের মতে, সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির আলোকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তারা বলছেন, অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু একটি বিভাগের প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে না, বরং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
অভিযোগ অস্বীকার
তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কামরুল হাসান।
তিনি বলেন, “আমি কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নই। সরকারি বিধিবিধান শতভাগ অনুসরণ করেই আমার দায়িত্ব পালন করছি। একটি স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে।”
নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের এই পরিস্থিতিতে গণপূর্ত বিভাগের প্রতি জনআস্থা অটুট রাখতে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদঘাটিত হলে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে জনসাধারণ সুস্পষ্ট ধারণা পাবে এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতাও নিশ্চিত হবে।

