শনিবার, জুন ১৩, ২০২৬

‘সার্ভার সমস্যা’ নাকি ঘুষের ফাঁদ? খুলনা পাসপোর্ট অফিস নিয়ে বি’স্ফোরক অ’ভিযোগ

চিকিৎসা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা বিদেশ ভ্রমণের প্রয়োজনেই প্রতিদিন শত শত মানুষ পাসপোর্ট করতে আসেন খুলনা বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে। তবে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, নির্ধারিত নিয়মে আবেদন করেও নানা অজুহাতে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে তাদের। আর এই সুযোগকে কেন্দ্র করে অফিসের বাইরে ও ভেতরে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী দালাল চক্র, যারা অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে দ্রুত সেবা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রেখেছে।

সম্প্রতি চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ভারতে যাওয়ার প্রয়োজন হওয়ায় জিনীয়া বেগম (ছদ্মনাম) পাসপোর্টের আবেদন করতে গিয়ে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। তিনি অভিযোগ করেন, অনলাইনে আবেদন সম্পন্ন করার পর অফিসে ফাইল জমা দিতে গেলে তাকে ‘সার্ভার জটিলতা’ ও ‘কাগজপত্রে সমস্যা’র কথা বলা হয়। পরে অফিসের বাইরে একটি ফটোস্ট্যাট দোকানে যোগাযোগ করলে অতিরিক্ত অর্থ দিলে দ্রুত কাজ সম্পন্ন হবে বলে জানানো হয়। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার পর তার আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় বলে তিনি দাবি করেন।

ঘুষের অর্থ ভাগাভাগির অভিযোগ

অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, খুলনা বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিন গড়ে কয়েকশ আবেদন জমা পড়ে, যার একটি বড় অংশ বিভিন্ন দালালের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। অভিযোগ রয়েছে, আবেদনকারীদের কাছ থেকে ফাইলভেদে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়।

সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ অফিসের বিভিন্ন স্তরে বণ্টন করা হয়। এ প্রক্রিয়ার সমন্বয়ের সঙ্গে অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অফিস ঘিরে সক্রিয় দালাল চক্র

স্থানীয়দের অভিযোগ, পাসপোর্ট অফিসের আশপাশে অবস্থিত কয়েকটি ফটোকপি, কম্পিউটার ও অনলাইন সেবা কেন্দ্রকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে একটি দালাল চক্র। এসব প্রতিষ্ঠানের কিছু কর্মী ও মধ্যস্বত্বভোগী আবেদনকারীদের বিভিন্ন সমস্যা দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে দ্রুত সেবা প্রদানের প্রস্তাব দেন।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অফিস সংলগ্ন কয়েকটি দোকান ও কম্পিউটার সেন্টারের মাধ্যমে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পরিচালক আবু সাইদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের অভিযোগ

খুলনা বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক মো. আবু সাইদের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, চাকরি জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মালিক হয়েছেন।

অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, চট্টগ্রাম ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তার নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক ফ্ল্যাট, বাড়ি, জমি এবং ব্যবসায়িক বিনিয়োগ রয়েছে। এসব সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও দুর্নীতিবিরোধী কর্মীরা।

দুদকের তদন্ত চলছে

এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) খুলনা বিভাগীয় উপপরিচালক মো. আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, “পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক মো. আবু সাইদসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বিরুদ্ধে প্রাপ্ত অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে। ইতোমধ্যে তাদের বক্তব্য গ্রহণ করা হয়েছে। তদন্ত শেষে কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।”

তিনি জানান, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্র, আর্থিক লেনদেন এবং সম্পদের তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ