Saturday, October 24, 2026

গহিরা প্যারাবনের মাটি কেটে বিক্রির অভিযোগ, অস্তিত্ব সংকটে উপকূল রক্ষার প্রাকৃতিক ঢাল

ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও উপকূলীয় দুর্যোগের সময় চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপকূলকে প্রাকৃতিক সুরক্ষা দিয়ে আসা গহিরা প্যারাবন এখন নিজেই হুমকির মুখে। সংরক্ষিত এই বনাঞ্চল থেকে অবৈধভাবে মাটি কেটে বিক্রি এবং বনভূমি উজাড়ের অভিযোগ উঠেছে। পরিবেশবিদ ও স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে উপকূলীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।

আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নে শঙ্খ নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় গড়ে ওঠা গহিরা প্যারাবন দীর্ঘদিন ধরে উপকূলকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে আসছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বিগত কয়েক বছরে বনভূমির একটি বড় অংশ উজাড় করে মাছের ঘের নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে বন বিভাগের সংরক্ষিত এলাকা ও আশপাশ থেকে মাটি কেটে তা বিভিন্ন নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গহিরা বেড়িবাঁধ নির্মাণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি প্রকল্পের কাজ চলছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি বনাঞ্চল সংলগ্ন এলাকা থেকে মাটি সংগ্রহ করে বাঁধ নির্মাণে ব্যবহার করছেন। এতে বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, প্যারাবনের পাশের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে মাটি কেটে নেওয়ায় সেখানে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বনাঞ্চলের অনেক অংশ এখন মাছের ঘের ও জলাশয়ে পরিণত হয়েছে।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে শহীদ বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দূরবর্তী স্থান থেকে মাটি সংগ্রহের নির্দেশনা দেওয়া হয়। কোথাও অনিয়ম হয়ে থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মনিরা পারভীন বলেন, উপকূলীয় এলাকায় অনুমতি ছাড়া মাটি কাটা আইনত দণ্ডনীয়। প্যারাবন উপকূলকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা দেয়। তাই এ ধরনের বন রক্ষায় প্রশাসনকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, ম্যানগ্রোভ বা প্যারাবন উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব বন ঢেউয়ের গতি কমায় এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বন ধ্বংস ও মাটি কাটার ফলে ভবিষ্যতে উপকূল আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বনভূমি দখল, গাছ কাটা ও মাছের ঘের নির্মাণ চললেও বন বিভাগ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এর ফলে প্রায় ২৫০ একর আয়তনের এই গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চলের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বাঁশখালী রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার ও রেঞ্জ কর্মকর্তা খায়রুল আলম বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত হয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছেন।

চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এম এ হাসান বলেন, অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। বন বিভাগের জমি থেকে মাটি কাটা বা বন উজাড়ের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে, এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মহিন উদ্দিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পরিবেশবিদদের মতে, গহিরা প্যারাবন শুধু একটি বন নয়; এটি উপকূলীয় মানুষের নিরাপত্তার অন্যতম প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। তাই বন ধ্বংস ও মাটি কাটার বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এর ভয়াবহ পরিবেশগত প্রভাব দেখা দিতে পারে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ