
দেশের অন্যতম শীর্ষ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য মোহাম্মদ শাহজাহানের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নির্দেশনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করেছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে ক্যাম্পাসে প্রবেশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এক অভিভাবকের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে গত ১৪ মে ইউজিসি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়। অভিযোগে বলা হয়, চাকরি, পদোন্নতি ও আর্থিক সহায়তার প্রলোভন দেখিয়ে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন, ভর্তি-বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নারী শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত রয়েছেন ট্রাস্টি সদস্য মোহাম্মদ শাহজাহান।
ইউজিসির নির্দেশনার পর ১৮ মে জরুরি সভা করে বোর্ড অব ট্রাস্টিজ। সভায় শাহজাহান ছাড়া অন্য সব সদস্য উপস্থিত ছিলেন। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয় এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাময়িকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। আগামী ৪ জুন বোর্ডের বৈঠকে তাকে লিখিত ব্যাখ্যা জমা দিতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব না পেলে ট্রাস্ট ও ট্রাস্টি বোর্ড থেকে অপসারণের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
নোটিশে শাহজাহানের বিরুদ্ধে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়ম, আর্থিক সুবিধা প্রদান, যৌন হয়রানি, ভর্তি প্রক্রিয়ায় অর্থ লেনদেন, উন্নয়ন প্রকল্পে প্রভাব খাটানো, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক অনিয়মের মতো একাধিক অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের দাবি, আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে নারী কর্মী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ার চেষ্টার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই ক্যাম্পাসে আলোচিত। বিভিন্ন ব্যক্তি ও সরকারি সংস্থার হাতে তার সঙ্গে নারী কর্মী ও শিক্ষার্থীদের কথিত অনৈতিক বার্তা আদান-প্রদানের স্ক্রিনশট ঘুরছে বলেও জানা গেছে।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মোহাম্মদ শাহজাহান। তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে ছড়ানো স্ক্রিনশটগুলো জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে এবং সেগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষা হওয়া উচিত। তার ভাষ্য, আগামী জুলাইয়ে তার ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হওয়ার কথা থাকায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা চলছে। তিনি বোর্ড অব ট্রাস্টিজকে আইনি নোটিশ দিয়েছেন বলেও জানান।
এদিকে শাহজাহানের বিরুদ্ধে অতীতের বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নথি জালিয়াতি, জমি কেনায় অর্থ আত্মসাত এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় কারাভোগের বিষয়গুলোও সামনে আসছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব ঘটনায় অতীতে সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল।
বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান আজিজ আল কায়সার বলেন, ইউজিসির চিঠির পরিপ্রেক্ষিতেই বোর্ড সর্বসম্মতভাবে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে। তিনি জানান, তদন্ত ছাড়া কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে নোটিশ দেওয়ার পর থেকে শাহজাহানের পক্ষ থেকে ফোন ও বার্তার মাধ্যমে হুমকি-ধমকি দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির উপাচার্য আবদুল হান্নান চৌধুরী এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, বিষয়টি ট্রাস্টি বোর্ডের অভ্যন্তরীণ বিষয়।
১৯৯২ সালে যাত্রা শুরু করা নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি বর্তমানে দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। তবে প্রতিষ্ঠানটির সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রশাসনিক অনিয়ম, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টানাপোড়েনও বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

