
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও একাধিক মেগা প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) এ.এস.এম. আশরাফুজ্জামানকে ঘিরে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কমিশন বাণিজ্য, প্রকল্পে অনিয়ম এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের নানা অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ঠিকাদার ও স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তিনি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেন।
মেগা প্রকল্প ঘিরে সিন্ডিকেটের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সন্দ্বীপ, কক্সবাজারের সোনাদিয়া এবং টেকনাফের সাবরাং ও জালিয়ার দ্বীপ এলাকায় বাস্তবায়নাধীন জেটি ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে।
“Development of Jetties and Infrastructure at Mirsarai & Sandwip at Chattogram, Subrang and Jaliar Dwip at Teknaf and Sonadia Dwip at Cox’s Bazar” প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় দরপত্র প্রক্রিয়া, কাজ বণ্টন এবং বিল অনুমোদনে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, বড় টেন্ডারগুলো আগেই নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। সাধারণ ঠিকাদারদের বিভিন্নভাবে নিরুৎসাহিত করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগ বা অপমানজনক আচরণের ঘটনাও ঘটে বলে দাবি তাদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, “বড় কোনো কাজ পেতে হলে আগে সমঝোতা করতে হয়। কমিশন ছাড়া ফাইল এগোয় না।”
কমিশন বাণিজ্য ও ‘সিন্ডিকেট’ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গোপনে রেট সমন্বয় করা হয় এবং নির্দিষ্ট কমিশনের বিনিময়ে পছন্দের ঠিকাদারদের কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিআইডব্লিউটিএ’র ভেতরেই একটি ঘনিষ্ঠ চক্র পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করে। এমনকি কমিশন আদায়ের জন্য আলাদা লোকও কাজ করে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা ও ঠিকাদার।
প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগ
নদী খনন, জেটি নির্মাণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রমে নিম্নমানের কাজের অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, পর্যাপ্ত সমীক্ষা ও কারিগরি যাচাই ছাড়া কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন হওয়ায় নদীভাঙন, চর জেগে ওঠা এবং নৌপথ সংকটের মতো সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, কিছু প্রকল্পে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কারণে কয়েক বছরের মধ্যেই অবকাঠামোগত দুর্বলতা দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।
যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ
আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরির আয়ের তুলনায় বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট, বাড়ি ও জমি রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব সম্পদের একটি বড় অংশ সম্পদ বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, স্বাধীন তদন্ত হলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
বিআইডব্লিউটিএ’র একাধিক সূত্রের দাবি, অতীতে প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে তিনি নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেন। অভিযোগ রয়েছে, সেই প্রভাব ব্যবহার করে বড় প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখেন।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তার প্রভাব কমেনি। বরং প্রশাসনিক যোগাযোগের মাধ্যমে এখনো তিনি একইভাবে প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন।
বাজেট সংকটেও নতুন টেন্ডার নিয়ে প্রশ্ন
সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে, বাজেট সংকটের মধ্যেও শত শত কোটি টাকার নতুন টেন্ডার আহ্বানের যৌক্তিকতা নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু টেন্ডারের মূল উদ্দেশ্য ছিল কমিশন বাণিজ্য এবং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে কাজ পাইয়ে দেওয়া।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্প ব্যয় বাড়ানোর জন্য সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তদন্তের দাবি
সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে টেন্ডার সিন্ডিকেট ও কমিশন বাণিজ্যের সংস্কৃতি বন্ধ না হলে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে না।
তাদের দাবি, বিআইডব্লিউটিএ’র গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোতে স্বাধীন নিরীক্ষা, উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়া এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে এ.এস.এম. আশরাফুজ্জামানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

