
রাজধানীর মিরপুর-১৩ এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ঢাকা মেট্রো–০১ কার্যালয়কে ঘিরে নানা অনিয়ম, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে ফিটনেস শাখায় দায়িত্ব পালনকারী সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) শেখ মো. ইমরানের বিরুদ্ধে দালালচক্রকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ করেছেন একাধিক সেবাগ্রহীতা।
ভুক্তভোগীদের দাবি, সাধারণ নিয়মে সেবা নিতে গেলে দীর্ঘসূত্রতা, জটিলতা ও হয়রানির মুখে পড়তে হয়। তবে দালালের মাধ্যমে গেলে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। তাদের অভিযোগ, অফিসের ভেতরে সক্রিয় একটি সিন্ডিকেট পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করছে।
ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস নবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবায় নির্ধারিত সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।
নরসিংদীতে নথি গায়েবের ঘটনায়ও ছিল আলোচনা
শেখ মো. ইমরান এর আগে নরসিংদী বিআরটিএ সার্কেলে সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার দায়িত্বকালেই ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে রেকর্ড রুম থেকে বিপুলসংখ্যক ড্রাইভিং লাইসেন্সের ভলিউম গায়েব হওয়ার ঘটনা প্রকাশ্যে আসে।
তথ্যানুসারে, অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের ৬৮টি এবং পেশাদার লাইসেন্সের ২৭টি ভলিউম নিখোঁজ হয়। এর মধ্যে ১৩টি ছিল ম্যানুয়াল পেশাদার লাইসেন্স ভলিউম, যেখানে মোট ২২০৩ জন চালকের তথ্য সংরক্ষিত ছিল।
এছাড়া ৫৭টি ম্যানুয়াল অপেশাদার লাইসেন্স ভলিউমে প্রায় ১১ হাজার ৪০০ চালকের তথ্য ছিল বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এসব ম্যানুয়াল নথি হারিয়ে যাওয়ায় তথ্য পুনরুদ্ধার প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
তবে ২০২২ ও ২০২৩ সালের কিছু অনলাইন লাইসেন্সের তথ্য বিআরটিএ’র আইএস সফটওয়্যারে সংরক্ষিত থাকায় সেগুলো পুনরায় তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
মামলা হলেও কাটেনি রহস্য
নথি গায়েবের ঘটনায় ২০২৪ সালের ২৮ জানুয়ারি নরসিংদী মডেল থানায় পেনাল কোডের ৪৫৭ ও ৩৮০ ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
মামলার তদন্তে আটজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হলেও পরে তদন্ত প্রতিবেদনে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়। ২০২৪ সালের ২৫ এপ্রিল আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।
মামলার বাদী শফিকুল ইসলাম ভূঞা জানান, অফিসে এসে রেকর্ড রুমে সংরক্ষিত ভলিউম কম দেখতে পান তিনি। পরে অনুসন্ধানে শতাধিক ভলিউম নিখোঁজ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়।
তবে ঘটনার শুরুতে রেকর্ড রুমের দরজা, জানালা কিংবা ছাদে কোনো ভাঙচুরের চিহ্ন না থাকলেও পরে সিলিং ভাঙা অবস্থায় দেখা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিভাগীয় তদন্ত ও পুরোনো অনিয়মের ইতিহাস
ঘটনার পর বিআরটিএ চেয়ারম্যান তদন্তের দায়িত্ব দেন ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) স্বদেশ কুমার দাসকে। তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের ১২ নভেম্বর প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।
স্বদেশ কুমার দাস বলেন, আদালতে মামলা চলমান থাকায় তদন্তে কাউকে সরাসরি দায়ী করা হয়নি। প্রয়োজনে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে পুনরায় তদন্ত করা যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিআরটিএতে নথি গায়েবের ঘটনা নতুন নয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে নথি গায়েবের ঘটনায় ২৯ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ১১টি মামলা হয়েছিল।
এছাড়া বিভিন্ন সময়ে নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা দক্ষিণ ও পাবনা সার্কেল অফিসেও লাইসেন্স ও রেজিস্ট্রেশনের হাজারো নথি গায়েব হওয়ার অভিযোগ ওঠে। দুদক সূত্রের দাবি, এসব ঘটনায় সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
বিলাসবহুল গাড়ির নিবন্ধন নিয়েও প্রশ্ন
২০১৯ সালে করদাতার পরিচিতি নম্বর (টিআইএন) ছাড়া ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে বিএমডব্লিউ, অডি ও জাগুয়ারসহ বিভিন্ন বিলাসবহুল গাড়ির নিবন্ধনের অভিযোগ ওঠে। পরে বিআরটিএ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ৮৯১টি বিলাসবহুল গাড়ির তালিকা দেয়, যার মধ্যে ২৫৭টির নিবন্ধন টিআইএন নম্বর ছাড়া করা হয়েছিল বলে জানা যায়।
বক্তব্য মেলেনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার
অভিযোগের বিষয়ে জানতে সহকারী পরিচালক শেখ মো. ইমরানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সচেতন মহলের মতে, গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তারা মনে করেন, প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হলে একদিকে যেমন সেবাগ্রহীতাদের আস্থা ফিরবে, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতাও নিশ্চিত হবে।

