শুক্রবার, মে ২২, ২০২৬

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদে চাকরি ও দু’র্নী’তির অ’ভিযোগে আলোচনায় সাব-রেজিস্ট্রার ওমর ফারুক

সম্প্রতি অবসরে যাওয়া সাব-রেজিস্ট্রার মো. ওমর ফারুককে ঘিরে উঠেছে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহারের অভিযোগ। সর্বশেষ শরীয়তপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত থাকা এই কর্মকর্তা গত ১৪ জুন অবসরে যান। তবে অবসরের পরও তার কর্মকাণ্ড ও সম্পদের উৎস নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রগুলোর অভিযোগ, চাকরি জীবনের বিভিন্ন কর্মস্থলে তিনি ঘুষ, অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে বিতর্কিত কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি পান। অভিযোগ রয়েছে, দলিল রেজিস্ট্রি, জমির শ্রেণি পরিবর্তন, নকল উত্তোলন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সেবায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের মাধ্যমে তিনি বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন।

মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে প্রশ্ন

অনুসন্ধানে জানা যায়, মো. ওমর ফারুকের জন্ম ১৯৬৫ সালের ১৫ জুন। সে হিসেবে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর। এরপরও তিনি “মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী” পরিচয়ে মুক্তিযোদ্ধা-সংশ্লিষ্ট সুবিধা নিয়ে চাকরিতে নিয়োগ পান বলে অভিযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, ২০১০ সালে আপিল বিভাগের রায়ের পর মুজিবনগর সরকারের ১৯০ জন কর্মচারীকে সাব-রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগের জন্য একটি যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি যাচাই শেষে মাত্র ৩০ জনকে প্রকৃত কর্মচারী হিসেবে চিহ্নিত করলেও পরে রাজনৈতিক বিবেচনায় অধিকাংশকেই নিয়োগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মো. ওমর ফারুক নিজেকে “সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা” দাবি করেন। তবে মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে চাকরি করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

বিভিন্ন কর্মস্থলে অনিয়মের অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ধানমন্ডি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দায়িত্ব পালনকালে তিনি একক প্রভাব বিস্তার করেন। পরে ২০২২ সালে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যোগদানের পরও ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে রাজস্ব ফাঁকি, সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, মূল দলিলের নকল তুলতে অতিরিক্ত ফি নেওয়া এবং দলিলে গ্রহীতার নাম পরিবর্তনের মতো নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন তিনি।

এছাড়া তার বিরুদ্ধে নারীঘটিত অভিযোগও রয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দুদকের অভিযানের অভিযোগ

২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর শরীয়তপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি হওয়ার পরও থেমে থাকেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি একটি অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাদারীপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের একটি টিম অফিসটিতে অভিযান পরিচালনা করে।

অভিযোগ ছিল—সেবাগ্রহীতাদের জিম্মি করে অবৈধভাবে অর্থ আদায়, জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি, অতিরিক্ত ফি আদায় এবং টাকার বিনিময়ে ভুয়া তথ্যসংবলিত নকল সরবরাহের মতো কর্মকাণ্ড।

তবে সংশ্লিষ্ট মহলে গুঞ্জন রয়েছে, পরবর্তীতে প্রভাব খাটিয়ে বিষয়টি “ম্যানেজ” করা হয়। যদিও এ বিষয়ে দুদকের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সিন্ডিকেট ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ

সাব-রেজিস্ট্রি অফিস সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, প্রতি দলিলের ক্ষেত্রে জমির মূল্যের ওপর অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের একটি অলিখিত নিয়ম চালু ছিল। একই সঙ্গে নকলনবীশ ও দলিল লেখকদের একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমেও সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

শত কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ

অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, চাকরি জীবনে মো. ওমর ফারুক বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। ঢাকা ও বরিশালসহ বিভিন্ন স্থানে তার নামে-বেনামে সম্পদ থাকার অভিযোগ রয়েছে।

যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি।

সচেতন মহলের মতে, একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যদি ভুয়া সনদ ব্যবহার, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে, তবে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তারা।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে সাব-রেজিস্ট্রার মো. ওমর ফারুকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজেকে “সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা” বলে দাবি করেন। তবে অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করেননি।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ