শুক্রবার, মে ২২, ২০২৬

বিআইডব্লিউটিএ নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও জালিয়াতির অ’ভিযোগ, কোটি টাকার সি’ন্ডিকেট নিয়ে তোলপাড়

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে প্রশ্নফাঁস, ডামি পরীক্ষার্থী এবং কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে এই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে এবং জনপ্রতি ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার চুক্তি করা হচ্ছে।

পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ

গত ১৬ মে রাজধানীর মিরপুর বাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং মিরপুর গার্লস আইডিয়াল কলেজ কেন্দ্রে বিআইডব্লিউটিএ’র তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। নির্ধারিত সময় ছিল বিকেল ৩টা থেকে ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত।

তবে অভিযোগ উঠেছে, পরীক্ষা শুরুর আগেই দুপুর ২টা ৫৪ মিনিটে প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি মুহূর্তেই বিভিন্ন পরীক্ষাকেন্দ্রে ছড়িয়ে পড়লে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২১ জন লস্কর, ১ জন বাস হেলপার, ২৩ জন শুল্ক প্রহরী, ৬ জন মার্কম্যান, ১৩ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং ২ জন ড্রাইভারসহ মোট ৬৬টি পদের জন্য এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ

বাংলাদেশ গেজেটের ১৯৯০ সালের নিয়োগ বিধিমালার ২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এমএলএসএস, গার্ড, নৈশপ্রহরী, শুল্ক প্রহরী ও ক্লিনারসহ চতুর্থ শ্রেণির কিছু পদে শুধুমাত্র মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের বিধান রয়েছে।

কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, সেই বিধান উপেক্ষা করে লিখিত পরীক্ষার আয়োজন করা হয়, যাতে প্রশ্নফাঁস ও খাতা বদলের মতো জালিয়াতির সুযোগ তৈরি হয়।

‘ডামি পরীক্ষার্থী’ দিয়ে তিন ধাপের জালিয়াতি

বিআইডব্লিউটিএ’র এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নিয়োগ সিন্ডিকেটটি মূলত তিন ধাপে জালিয়াতি সম্পন্ন করে।

তার ভাষ্যমতে—

  • প্রথম ধাপে মোট চুক্তির ৩০ শতাংশ টাকা নিয়ে প্রকৃত প্রার্থীর বদলে ডামি পরীক্ষার্থী লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেয়
  • দ্বিতীয় ধাপে ব্যবহারিক পরীক্ষাতেও একইভাবে ডামি প্রার্থী অংশগ্রহণ করে এবং আরও ৩০ শতাংশ অর্থ লেনদেন হয়
  • শেষ ধাপে মৌখিক পরীক্ষার সময়ও ডামি প্রার্থী অংশ নেয় এবং চূড়ান্ত ফলের পর বাকি ৪০ শতাংশ টাকা ভাগাভাগি করা হয়

অভিযোগ রয়েছে, এবার পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীদের ছবি ও স্বাক্ষর সঠিকভাবে যাচাই করা হয়নি। ফলে ভুয়া পরীক্ষার্থী ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়।

সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিগত সরকারের সময় থেকে সক্রিয় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এখনো নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িত। এই চক্রের সঙ্গে সাবেক শ্রমিক লীগ নেতাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অযোগ্য প্রার্থীদের চাকরি দেওয়া হয়েছিল এবং একই ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

নিয়োগ কমিটির বক্তব্য

এ বিষয়ে নিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক ও বিআইডব্লিউটিএ’র সদস্য (পরিকল্পনা ও পরিচালন) মো. সাজেদুর রহমান সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, “পরীক্ষা পরিচালনা করেছে মেরিডিয়ান ইউনিভার্সিটি এবং খাতাও তারাই মূল্যায়ন করছে। এখানে প্রশ্নফাঁসের সুযোগ নেই।”

চতুর্থ শ্রেণির পদে লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে তিনি জানান, কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।

তদন্ত ও পুনঃপরীক্ষার দাবি

ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থী ও সচেতন মহল দাবি জানিয়েছেন, প্রশ্নফাঁস ও জালিয়াতির অভিযোগ তদন্ত করে বর্তমান নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করতে হবে। একইসঙ্গে নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, উত্তরপত্রের হাতের লেখা যাচাই, হাজিরা শিটের স্বাক্ষর মিলিয়ে দেখা এবং পূর্ববর্তী নিয়োগগুলোও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।

সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এ ধরনের অভিযোগ প্রতিষ্ঠানটির স্বচ্ছতা ও জনআস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ