Thursday, August 20, 2026

পাবনা গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবীরকে ঘিরে অ’নি’য়ম-দু’র্নী’তির একাধিক অভিযোগ

পাবনা গণপূর্ত বিভাগে একের পর এক অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিভাগের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবীর। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, চাকরিজীবনে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি রাজধানীর উত্তরা এলাকায় বিলাসবহুল স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট, পাবনা শহরে বাড়ি এবং ভাঙ্গুড়া এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমিসহ নামে-বেনামে শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাবনা গণপূর্ত বিভাগের অধীনে নির্মাণাধীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীতকরণ প্রকল্পের ১০ তলা মূল ভবনের বেজমেন্টের পিলার নির্মাণে পাথরের পরিবর্তে ব্রিকচিপস বা ইটের খোয়া ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবীর কিংবা সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সাজিন কনস্ট্রাকশনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে পাবনা গণপূর্ত বিভাগের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদে মানববন্ধনের ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ফটোগ্রাফার হিসেবে পরিচিত খালেদ হোসেন পরাগ। গত ২৩ জুলাই নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে এ বিষয়ে একটি পোস্ট দেওয়ার পর সেটি রহস্যজনকভাবে আর দেখা যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে।

অন্যদিকে, স্থানীয় গণমাধ্যমে নিজের বঞ্চিত হওয়ার বিষয়ে সাক্ষাৎকার দেওয়া এবং রাজশাহী জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর কাছে রাশেদ কবীরের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ জানিয়ে চিঠি দেওয়ার পর ঠিকাদার মিনহাজ উদ্দিনকে একদল অপরিচিত ব্যক্তি বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাকে পাবনার বিভিন্ন স্থানে ঘোরানোর পর গণপূর্ত কার্যালয়ে নিয়ে একটি প্যাডে ওই চিঠির বিরুদ্ধে আরেকটি চিঠি লিখিয়ে নেওয়া হয়। পাশাপাশি তার একটি ভিডিও বক্তব্যও ধারণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঘটনার পর থেকে ঠিকাদার মিনহাজ উদ্দিন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। গণমাধ্যমে কথা বলার পরিণতি নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন বলে জানা গেছে। তবে তাকে তুলে নেওয়া, জোর করে চিঠি লিখিয়ে নেওয়া কিংবা ভিডিও ধারণের অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

স্থানীয় সাংবাদিকদের একটি অংশের দাবি, রাশেদ কবীরের কথিত প্রভাব ও স্থানীয় পর্যায়ের যোগাযোগের কারণে তার বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশে অনেকে অনীহা দেখান। এমনকি তার বক্তব্য নিতে গেলেও গণমাধ্যমকর্মীদের মামলা-মোকদ্দমা ও হামলার ভয় দেখানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে চাকরির বিধি লঙ্ঘন করে নিজ জেলা পাবনায় পোস্টিং নেওয়ার পর রাশেদ কবীরের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও কথিত গোপন টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ বাড়তে থাকে। পরবর্তীতে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে তার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও ওঠে।

পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীতকরণ প্রকল্পে কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিভিন্ন খাতে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে পিপিআরের বিধি লঙ্ঘন করে নির্মাণাধীন ভবনের ৯ তলার ওপরে ‘গ্লাস টাওয়ার’ নির্মাণের নামে প্রায় ৫ কোটি টাকা উত্তোলন ও ভাগ-বাটোয়ারার অভিযোগ উঠেছে।

পাবনা গণপূর্ত বিভাগের আহ্বান করা একটি দরপত্রে (টেন্ডার আইডি-১২১৭৬৫০) হাসপাতাল ভবনের ‘এ’ ব্লকসংলগ্ন খোলা ছাদে কাচের কাজের উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ৪ কোটি ৯৬ লাখ ৮৮ হাজার ৯৫৫ টাকার কাজটি এসএ এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এর বিল পরিশোধ করা হয়েছে। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, বাস্তবে ওই কাজের অস্তিত্ব নেই।

প্রতিষ্ঠানটির মালিক হিসেবে উল্লেখ করা দ্বীন ইসলাম গণমাধ্যমের কাছে তার লাইসেন্স ব্যবহারের অনুমতি শাহাদাত হোসেনকে দেওয়ার কথা স্বীকার করলেও কাজটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি অবগত নন বলে জানিয়েছেন।

এছাড়া হাসপাতালের মূল নির্মাণকাজ শেষ না হলেও ‘রিমেইনিং ওয়ার্কস’ দেখিয়ে ছয়টি গ্রুপে দরপত্র আহ্বান করে পছন্দের ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়ে প্রায় ২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। একই সঙ্গে পিপিআরের বিধিবহির্ভূতভাবে টেন্ডারের প্যাকেজ অনুমোদনে সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারের স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগও রয়েছে।

রূপপুর গ্রিন সিটিতে যন্ত্রপাতি কেনায় বড় অঙ্কের অনিয়মের অভিযোগ

পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন প্রকল্প ‘গ্রিন সিটি’র ১১টি ভবনের বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি ও জেনারেটর কেনায় বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) কার্যালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেসব যন্ত্রপাতির সরকারি মূল্য প্রায় ২৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা, সেগুলো কিনতে মোট ২১৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। অর্থাৎ সরকারি নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।

সিএজি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্ধারিত দর ও দাপ্তরিক প্রাক্কলনের তুলনায় অস্বাভাবিক মূল্যে এসব যন্ত্রপাতি কেনায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। দরপত্র প্রণয়ন, মূল্যায়ন, কার্যাদেশ, বিল অনুমোদন ও অর্থ পরিশোধের বিভিন্ন ধাপ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দরপত্রের মোট মূল্য প্রাক্কলনের কাছাকাছি রাখতে কিছু পণ্যের দাম কম দেখিয়ে বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র ও জেনারেটরের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়। এতে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে সরকারি দরের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে বলে নিরীক্ষায় উঠে এসেছে।

একটি ভবনেই অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ প্রায় ১৮ কোটি টাকা

সিএজি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা সাত নম্বর ভবনের হিসাবেও বড় ধরনের পার্থক্য পাওয়া গেছে। সেখানে—

  • উচ্চ ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রপাতির সরকারি নির্ধারিত মূল্য ছিল ১০ লাখ ৩২ হাজার টাকা। এর বিপরীতে বিল করা হয়েছে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
  • একটি ডিস্ট্রিবিউশন ট্রান্সফরমারের নির্ধারিত মূল্য ছিল ৪০ লাখ ৪০ হাজার টাকা। বিল করা হয়েছে ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
  • নিম্ন ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ১৬ লাখ ৩১ হাজার টাকা। এর বিপরীতে বিল করা হয়েছে ৩ কোটি ২ লাখ টাকা।
  • পাওয়ার ফ্যাক্টর কারেকশন প্যানেলের সরকারি মূল্য ১০ লাখ টাকার কম হলেও বিল করা হয়েছে ২ কোটি টাকা।
  • দুটি জেনারেটরের সরকারি নির্ধারিত মূল্য ছিল ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এর বিপরীতে বিল করা হয়েছে ৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।

এই পাঁচ ধরনের যন্ত্রপাতির জন্য সাত নম্বর ভবনে মোট ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা বিল করা হলেও সরকারি মূল্য ছিল ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।

তিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ ১৮৭ কোটি টাকা

নথিপত্র পর্যালোচনায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড পাঁচটি ভবনের জন্য প্রায় ৯২ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে। এসব যন্ত্রপাতির সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ১২ কোটি ২৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ পার্থক্য প্রায় ৭৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।

অন্যদিকে, সাজিন কনস্ট্রাকশনের আরেক প্রতিষ্ঠান সাজিন এন্টারপ্রাইজ চারটি ভবনের জন্য ৮২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা পেয়েছে। এসব যন্ত্রপাতির সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা। পার্থক্য প্রায় ৭২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।

এমএসসিএল-জিকেবিপিএল যৌথ উদ্যোগ দুটি ভবনের জন্য পেয়েছে ৩৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এসব যন্ত্রপাতির সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এখানে পার্থক্য প্রায় ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।

সব মিলিয়ে তিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ১১টি ভবনের যন্ত্রপাতির জন্য প্রায় ২১৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা দেওয়া হলেও সরকারি নির্ধারিত মূল্য ছিল মাত্র ২৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। ফলে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৮৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা, যা সিএজি নিরীক্ষায় আর্থিক অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ দুটি ইউনিটের মোট ক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। ২০১৭ সালের নভেম্বরে প্রথম ইউনিটের কাজ শুরু হয় এবং পরের বছর দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন ‘গ্রিন সিটি’র ১১টি ভবনের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনাকাটায় পাওয়া এই আর্থিক অনিয়মের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি ও বিল-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আপত্তিকৃত ১৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা উদ্ধার করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করেছে নিরীক্ষা সংস্থা।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ