
নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়ম, সিন্ডিকেটভিত্তিক ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ, পার্সেন্টেজ বাণিজ্য এবং দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ। সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, তার বিরুদ্ধে বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা, পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া, ডিজিটাল টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কারসাজি এবং কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল পরিশোধের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়মের কারণে বিভাগের উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে অনিয়ম ও বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসার অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছিল। তবে রাজনৈতিক প্রভাব ও অবৈধ অর্থের প্রভাবে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বর্তমান সময়েও তিনি আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদারকে বেছে বেছে কাজ দিচ্ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের নামে কার্যাদেশ এনে নিজেই কাজ পরিচালনা করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ওটিএম টেন্ডার আইডি-১২০৩১৮৩ এর মাধ্যমে প্রায় ১১ কোটি ৬৫ লাখ ৫৯ হাজার টাকার চুক্তিতে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীতকরণ প্রকল্পের অবশিষ্ট সিভিল, স্যানিটারি, বৈদ্যুতিক, সীমানা প্রাচীর, করিডোর ও অভ্যন্তরীণ সড়কের কাজ রাজশাহীর মেসার্স ব্রাদার্স কনস্ট্রাকশনকে পাইয়ে দেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ডিজিটাল কারসাজির মাধ্যমে কার্যাদেশ দেওয়া হয় এবং অভ্যন্তরীণ বৈদ্যুতিকরণসহ বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন না হলেও বাস্তব অগ্রগতির তুলনায় বেশি বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
একই প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে প্রায় ১৮ কোটি ৭০ লাখ টাকার চুক্তিতে নারায়ণগঞ্জের আলীগঞ্জে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজেও সিডিউল অ্যালাইনমেন্ট, নকশাবহির্ভূত নির্মাণ এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
মডেল মসজিদ প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওটিএম টেন্ডার আইডি-১২৪৩৪৬১ এর মাধ্যমে প্রায় ৯ লাখ ৫৪ হাজার টাকার ক্রোকারিজ সরবরাহের কাজ সাবেক ছাত্রলীগ নেতা দীন মোহাম্মদের মালিকানাধীন এস.এ. এন্টারপ্রাইজকে দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির মালিক পলাতক থাকায় বাস্তবে কাজটি নির্বাহী প্রকৌশলী নিজেই পরিচালনা করেছেন।
এছাড়া বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের জাদুঘর ভবন সম্প্রসারণ প্রকল্পে প্রায় ৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকার কাজ মেসার্স এম.এন. হুদা কনস্ট্রাকশন লিমিটেডকে দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, ড্রেন, সীমানা প্রাচীর, সংযোগ সড়ক ও ঘাট নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজ অসম্পূর্ণ থাকা সত্ত্বেও ২০২৬ সালের জুনে পুরো বিল পরিশোধ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একটি অংশ কাজের মান নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও প্রায় ১৯ লাখ ৮১ হাজার টাকার চুক্তিতে নারায়ণগঞ্জ সদর হাসপাতালে গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ মেসার্স লিঙ্কার্স ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনালকে দেওয়া হয়। একইভাবে নার্সিং কলেজের অবশিষ্ট নির্মাণকাজ, আড়াইহাজার থানা ভবন নির্মাণ এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রেকর্ড রুম সংস্কারসহ একাধিক প্রকল্পেও পছন্দের ঠিকাদারদের কার্যাদেশ দিয়ে জালিয়াতি ও কারসাজির অভিযোগ করেছেন কয়েকজন বঞ্চিত ঠিকাদার।
অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ এর আগেও রাজশাহীতে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে প্রকৌশলগত অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হন।
অন্যদিকে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে আরএফকিউ (RFQ) পদ্ধতির বিভিন্ন ক্ষুদ্র মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এপিপি তালিকায় ১৭টি আরএফকিউ কাজ থাকলেও ই-জিপিতে ১২টি টেন্ডারের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব কাজের অধিকাংশের চুক্তিমূল্য প্রায় ৩ লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয় এবং পদ্মা কনস্ট্রাকশন, ইভা বিল্ডার্স, মাতৃছায়া কনস্ট্রাকশন, এস.এন. ট্রেডার্স, এন. ইসলাম ট্রেডার্স, কুঁড়ে ঘরসহ কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
এসব আরএফকিউ কাজের মধ্যে ছিল নারায়ণগঞ্জ কারাগার, সরকারি কোয়ার্টার, ফায়ার সার্ভিস ব্যারাক, ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল, মীর জুমলা কোয়ার্টার, ই/এম সাব-ডিভিশন, নির্বাহী প্রকৌশলীর বাসভবন, পুলিশ সুপারের বাসভবন, ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের চিকিৎসকদের আবাসন, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এবং বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় মেরামত, স্যানিটারি, ড্রেন, সেপটিক ট্যাংক, সোক-ওয়েল ও পরিচ্ছন্নতাসংক্রান্ত কাজ। নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, এসব কাজের অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবে কাজ না করেই পুরো বরাদ্দ উত্তোলন করে ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়েছে।
এছাড়া নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে নামে-বেনামে অবৈধ সম্পদ অর্জন, ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা এবং আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের আর্থিকভাবে পুনর্বাসনের অভিযোগও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

