Sunday, August 23, 2026

চৌগাছা উপজেলা প্রশাসনে ইউএনওর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের অভিযোগ

যশোরের চৌগাছা উপজেলা প্রশাসনে ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি অর্থের অনিয়ম এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ে একটি কথিত সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা সিরাজের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও উপজেলা প্রশাসনের কার্যক্রমে অনিয়মের চিত্র বদলায়নি। বরং স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও এক সাংবাদিককে ঘিরে ইউএনও একটি প্রভাববলয় তৈরি করেছেন।

টেন্ডার ছাড়াই বিল উত্তোলনের অভিযোগ

অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা রাজস্ব খাতের সরকারি বাসা, বাংলো ও দপ্তর মেরামতের জন্য প্রতি অর্থবছরে বরাদ্দ থাকা প্রায় ১০ লাখ টাকা নামমাত্র কাজ দেখিয়ে তুলে নেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি বিধি অনুযায়ী ৪০ হাজার টাকার বেশি ব্যয়ের কাজের ক্ষেত্রে দরপত্র আহ্বানের বাধ্যবাধকতা থাকলেও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি।

এ ছাড়া উপজেলা পরিষদের নিয়ম অনুযায়ী বিল উত্তোলনের ক্ষেত্রে উপজেলা প্রকৌশলীর স্বাক্ষর প্রয়োজন হলেও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।

বিষয়টি সম্পর্কে উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ইউনুস আলী বলেন, শুরুতে তিনি বিলে স্বাক্ষর করতে রাজি হননি। তবে ইউএনওর পক্ষ থেকে প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করা হলে চাকরি রক্ষার স্বার্থে শেষ পর্যন্ত বিল ছাড়তে বাধ্য হন বলে দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে সাবেক উপজেলা প্রকৌশলী সিদ্ধার্থ কুমার কুন্ডু বলেন, সংশ্লিষ্ট বিল বা কাজের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। বর্তমানে তিনি বদলি হয়ে অন্যত্র দায়িত্ব পালন করছেন। নতুন যোগ দেওয়া উপজেলা প্রকৌশলী আলমগীর হোসেনও বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত না জানায় কোনো মন্তব্য করতে পারেননি।

সরকারি গাড়ি ও আবাসন ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ

স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, ইউএনও ফারজানা সিরাজ সরকারি গাড়ি নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজে ব্যবহার করছেন। বিশেষ করে বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ও শনিবার সরকারি গাড়িটি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ঝিনাইদহ ও যশোরে তার বাবার যাতায়াত এবং কখনো স্বামীকে ঢাকায় পৌঁছে দেওয়ার কাজেও সরকারি গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

সরকারি বাংলোর ভাড়া পরিশোধ না করার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে নিজস্ব চালক সোহেল, কৃষি কর্মকর্তার চালক অনিক, লাইসিয়াম স্কুলের একজন শিক্ষক, একজন মসজিদের ইমামসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিনামূল্যে সরকারি কোয়ার্টারে থাকার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) শামসুন নাহার প্রায় তিন বছর ধরে সরকারি বাসভবনে অবস্থান করলেও মাসিক নির্ধারিত ৩ হাজার টাকা হিসেবে কোনো ভাড়া সরকারি কোষাগারে জমা দেননি। সরকারি বাসভবন ভাড়া নির্ধারণ কমিটির সভাপতি ইউএনও নিজেই হওয়ায় এবং প্রকৌশলীদের পক্ষ থেকে তাগাদা দেওয়া হলেও এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।

এ ছাড়া উপজেলা চেয়ারম্যানের বাংলোতে বসবাসকারী সহকারী কমিশনার (ভূমি) জি এম মুনিম এবং সাবেক এসিল্যান্ড তাসমিন জাহানের বিরুদ্ধেও সরকারি আবাসনের ভাড়া পরিশোধ না করার অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।

সাংবাদিককে ঘিরে প্রভাববলয় তৈরির অভিযোগ

ইউএনওর কথিত প্রশাসনিক বলয়ের অন্যতম সহযোগী হিসেবে চৌগাছা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমানের নাম উল্লেখ করেছেন স্থানীয়রা। অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে কোনো সরকারি পদে না থাকলেও উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন গোপন বৈঠক ও আলোচনায় তার নিয়মিত উপস্থিতি রয়েছে।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, তিনি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক আলোচনায় হস্তক্ষেপ করেন, ইউএনওর পক্ষে অন্য কর্মকর্তাদের চাপ প্রয়োগ করেন এবং প্রশাসনের বিভিন্ন গোপন তথ্য আদান-প্রদানে ভূমিকা রাখেন।

এ ছাড়া অতীতে ‘খেজুর বাগান প্রকল্পের’ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে বিতর্কিত এই ব্যক্তিকে উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সচিব পদে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রেও ইউএনওর স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে।

সহযোগীদের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শামসুন নাহারের মাধ্যমে অসম্পূর্ণ কিংবা কথিত ভুয়া কাজের বিপরীতে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগে তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ঢাকায় তার একাধিক ফ্ল্যাট এবং ফরিদপুরে বিপুল সম্পত্তি রয়েছে। তবে এসব সম্পদের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোসাব্বির হোসেনের বিরুদ্ধেও কয়েক কোটি টাকার অনৈতিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র দাবি করেছে। মেহেরপুর, কুষ্টিয়া ও ঢাকায় তার সম্পদ থাকার কথা উল্লেখ করে অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেন, বদলির আদেশ থাকা সত্ত্বেও তিনি চৌগাছায় অবস্থান করছেন।

এ ছাড়া ক্রীড়া সামগ্রী কেনার বরাদ্দ এবং সমবায় দপ্তরের মাধ্যমে গবাদিপশুর ঋণ বিতরণেও স্বজনপ্রীতি ও অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।

রাজনৈতিক যোগাযোগের অভিযোগ

ফারজানা সিরাজ ৩৮তম বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তা। ২০১৮ সালে সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তার সরকারি চাকরিজীবন শুরু হয়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০২৩ সালে তিনি শার্শা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে যোগ দেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শার্শায় দায়িত্ব পালনের সময় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক সংসদ সদস্য শেখ আফিল উদ্দিনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় এবং সেই সময় থেকেই বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে। পরে চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে তার পদায়নের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক যোগাযোগের প্রভাব ছিল বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। তবে এসব রাজনৈতিক যোগাযোগ ও পদায়ন-সংক্রান্ত অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

চৌগাছায় প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি অর্থের অনিয়ম, সরকারি সম্পদের কথিত অপব্যবহার এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ে গড়ে ওঠা কথিত সিন্ডিকেটের অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের মতে, অভিযোগগুলো সঠিক হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন ও সরকারি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ