
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে (ডিপিএইচই) অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. আবদুল আউয়াল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বিভিন্ন সূত্রের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে অধিদপ্তরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন এবং বর্তমানে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, আবদুল আউয়ালের মূল পদ নির্বাহী প্রকৌশলী হলেও তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বের পাশাপাশি অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পূর্ত) এবং প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্বও রয়েছে। তার দ্রুত পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে অধিদপ্তরের ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, তার এই উত্থানের পেছনে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করেছে। প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রায় ৩৫ কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
রাজনৈতিক পরিচয় ও দ্রুত পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকৌশলী আবদুল আউয়াল কুয়েটে অধ্যয়নকালে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে কর্মজীবনে নিজেকে আওয়ামী লীগ-সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি অধিদপ্তরে প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আবদুল আউয়াল ১৯৯৮ সালের ৫ মার্চ একটি প্রকল্পে যোগ দেন। ২০০৬ সালে রাজস্ব খাতে এবং ২০১৩ সালে চাকরিতে নিয়মিত হন। এরপর ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর তাকে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর কিছুদিন পর ২০২৬ সালের ১১ জানুয়ারি তাকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পূর্ত) পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার প্রজ্ঞাপন জারি হয়। একই সময়ে তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বেও ছিলেন।
এভাবে অল্প সময়ের ব্যবধানে একজন নির্বাহী প্রকৌশলীর একাধিক শীর্ষ পদে দায়িত্ব পাওয়ার ঘটনা নিয়ে অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ এটিকে অস্বাভাবিক প্রশাসনিক উত্থান হিসেবে দেখছেন।
৩৫ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, শীর্ষ পদে দায়িত্ব পেতে আবদুল আউয়াল প্রায় ৩৫ কোটি টাকার লেনদেন করেছেন। এর মধ্যে তৎকালীন স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদী এবং সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার কাছে অর্থ দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। তবে এই দাবির পক্ষে কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি।
প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব দেওয়ার আগে ২০২৫ সালের মে মাসে পাঁচ কর্মকর্তার বিষয়ে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মূল্যায়ন প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আবদুল আউয়ালের বিরুদ্ধে নেতিবাচক তথ্য থাকা সত্ত্বেও তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
চাকরিজীবনে অনিয়মের নানা অভিযোগ
আবদুল আউয়ালের বিরুদ্ধে বেতনসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পে কর্মরত থাকার সময় থেকেই বিভিন্ন গ্রেডে বেতন উত্তোলনের ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে অগ্রিম বেতন উত্তোলনের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও করা হয়েছে।
নরসিংদীতে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে চালু করা সম্ভব হয়নি এবং পরে বিশেষ টিম গঠন করে অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করতে হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
ওই সময়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগও ওঠে। একজন ঠিকাদারের দাবি, চাহিদা অনুযায়ী অর্থ না দিলে বিল থেকে বড় অংশ কেটে নেওয়া হতো। বিপরীতে অর্থ দিলে কাজের মান নিয়ে তেমন প্রশ্ন তোলা হতো না। এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ প্রয়োজন।
এরপর নরসিংদী ও কিশোরগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে কাগজপত্রে কারসাজি এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠে। কিশোরগঞ্জ ও নরসিংদীর টেন্ডারসংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়গুলো অডিট আপত্তিতেও উঠে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিলেট ও ময়মনসিংহে দায়িত্ব পালন নিয়েও অভিযোগ
২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে আবদুল আউয়াল জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সিলেট সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব পান। পরে কুলাউড়া ও গোলাপগঞ্জ পৌরসভার পানি সরবরাহ ও পরিবেশগত স্যানিটেশন উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বও পান। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগেই নানা জটিলতা তৈরি হয় এবং পরামর্শক নিয়োগে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাত করা হয়।
ময়মনসিংহে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তিনি নিজ জেলা ময়মনসিংহে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। নিজ জেলায় দায়িত্ব পালন এবং সেখানে প্রভাব বিস্তারের বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
নোয়াখালীতে কম দামে নির্মাণসামগ্রী নিলামের অভিযোগ
নোয়াখালীতে ডানিডার অর্থায়নে একটি প্রকল্পের জন্য সংরক্ষিত প্রায় ৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকার পাইপ ও নির্মাণসামগ্রী মাত্র ১৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় নিলামে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের দাবি, প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে পরিচালনা করা হয়েছিল, ফলে অধিকাংশ ঠিকাদার দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাননি।
অভিযোগ অনুযায়ী, নিলাম প্রক্রিয়ায় আবদুল আউয়ালের নির্দেশনা ছিল। তবে নোয়াখালীর তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, নিলাম প্রক্রিয়াটি ঢাকা থেকে পরিচালিত হয়েছে। নিলাম থেকে পাওয়া অর্থের একটি অংশ আবদুল আউয়ালের কাছে যাওয়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার। এসব অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের কাছ থেকেও ঘুষের অভিযোগ
অধিদপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের পেনশন ও পিআরএল-সংক্রান্ত ফাইল অনুমোদনের ক্ষেত্রেও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এনএসআইয়ের প্রতিবেদনে প্রত্যেকের কাছ থেকে ১ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া এবং টাকা না দিলে ফাইল দীর্ঘদিন আটকে রাখার অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া ময়মনসিংহে কর্মরত অবস্থায় সাধারণ কর্মচারীদের বদলির ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। একই সময়ে ফুলপুর ও গৌরীপুর পৌরসভার পানি সরবরাহ প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পগুলো বর্তমানে অকার্যকর বলে অভিযোগ করা হয়েছে। গৌরীপুর পৌরসভায় পাম্পচালকদের বেতন বাবদ বছরে প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয় হলেও শহরবাসী পানি পাচ্ছেন না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সবশেষে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও আবদুল আউয়াল কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থেকে গেলেন এবং অল্প সময়ে একাধিক শীর্ষ দায়িত্ব পেলেন—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় তিনি নতুন করে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।
আবদুল আউয়ালের বিরুদ্ধে উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

