Sunday, August 2, 2026

গণপূর্তে আসবাবপত্র কেনাকাটায় ৭৭ কোটি টাকার অ’নিয়মের অ’ভিযোগ, ২২ কার্যাদেশে ক্রয়বিধি ল’ঙ্ঘ’নের দাবি

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম কাঠের কারখানা বিভাগের একাধিক আসবাবপত্র ক্রয়ে সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, যেসব কাজ ‘গুডস’ বা পণ্য সরবরাহ ক্যাটাগরিতে দরপত্র আহ্বানের কথা, সেগুলো ‘ওয়ার্কস’ বা নির্মাণকাজ ক্যাটাগরিতে আহ্বান করা হয়েছে। এরপর ধারাবাহিকভাবে বড় অঙ্কের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে। এ প্রক্রিয়ায় অভিজ্ঞতার শর্ত উপেক্ষা, প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়া প্রকল্পের প্যাকেজ পরিবর্তন এবং সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি গঠন না করার মতো একাধিক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

প্রাপ্ত নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম কাঠের কারখানা বিভাগের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজেদুল ইসলামের দায়িত্বকালে যশোর, কক্সবাজার, পাবনা ও নোয়াখালীর ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রকল্পের ২২টি কার্যাদেশে প্রায় ৭৭ কোটি টাকার আসবাবপত্র কেনাকাটায় এসব অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া পটুয়াখালী ও সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ, নরসিংদী জেলা কারাগার এবং ঢাকার অফিসার্স ক্লাবের আসবাবপত্র সরবরাহের ক্ষেত্রেও কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই প্রায় ৩০ কোটি টাকা বিল পরিশোধের অভিযোগ উঠেছে।

সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত বিষয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা প্রকৌশলী এস এম ফজলুল কবির বলেন, সরকারি ক্রয়বিধিতে (পিপিআর) ‘ওয়ার্কস’ ও ‘গুডস’-এর সংজ্ঞা সম্পূর্ণ পৃথক। ‘ওয়ার্কস’ মূলত নির্মাণকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, আর ‘গুডস’ বলতে পণ্য সরবরাহ বোঝায়। তাই গুডস ক্যাটাগরির কাজে ওয়ার্কস-সংক্রান্ত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ঠিকাদার নিয়োগের সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট পণ্য সরবরাহের বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকাই এ ধরনের কাজের জন্য প্রয়োজন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চারটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অফিস, একাডেমিক ভবন, অডিটোরিয়াম, চিকিৎসক ও শিক্ষকদের জন্য আসবাবপত্র প্রস্তুত ও সরবরাহের প্রায় সব দরপত্রেই একই ধরনের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী এসব কাজ ‘গুডস’ ক্যাটাগরির হলেও দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে ‘ওয়ার্কস’ হিসেবে। ফলে সরকারি ক্রয়বিধি উপেক্ষা করে আসবাবপত্র ক্রয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে।

নথি অনুযায়ী, সবচেয়ে বড় কার্যাদেশগুলোর একটি ছিল কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অফিস ও চিকিৎসকদের আসবাবপত্র প্রস্তুতের কাজ। প্রায় ৭ কোটি ৯ লাখ ২৯ হাজার টাকার এ কাজ পায় লামিয়া এন্টারপ্রাইজ। একই ধরনের প্রায় ৭ কোটি ৯ লাখ টাকার আরেকটি কার্যাদেশ পায় হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেড, যা ছিল পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অফিস ও চিকিৎসকদের আসবাবপত্র প্রস্তুতের জন্য। এছাড়া যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অফিস ও শিক্ষকদের আসবাবপত্রের ৫ কোটি ৮৪ লাখ ৯ হাজার টাকার কাজ দেওয়া হয় এসএস এন্টারপ্রাইজকে। যশোর, পাবনা ও নোয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অডিটোরিয়াম ও অন্যান্য আসবাবপত্রের প্রতিটি ৫ কোটি ৩৯ লাখ ৭১ হাজার টাকার কার্যাদেশ যথাক্রমে এম/এস সুমন, আখতার ফার্নিশার্স লিমিটেড এবং এস. ইসলাম কনস্ট্রাকশনকে দেওয়া হয়।

নথি বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ২২টি কার্যাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এস. ইসলাম কনস্ট্রাকশন তিনটি কার্যাদেশ পায়। লামিয়া এন্টারপ্রাইজ, এসএস এন্টারপ্রাইজ, হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেড, ডালাস ইন্টারন্যাশনাল এবং রুবেল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল দুটি করে কার্যাদেশ পেয়েছে। অবশিষ্ট কাজ ভাগ হয়েছে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে।

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, এক বা দুটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অধিকাংশ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব উৎপাদন কারখানা, আধুনিক যন্ত্রপাতি কিংবা বড় পরিসরে আসবাবপত্র সরবরাহের অভিজ্ঞতা নেই। অনেক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এমনকি পণ্য সরবরাহ-পরবর্তী সেবা প্রদানের সক্ষমতা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মো. সাজেদুল ইসলাম গণপূর্তের কাঠের কারখানা বিভাগের দায়িত্বে থাকাকালে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ, সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ এবং ঢাকার অফিসার্স ক্লাবের আসবাবপত্র ক্রয়েও অনিয়ম হয়েছে। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে নরসিংদীর নতুন জেলা কারাগারের আসবাবপত্র ক্রয়কে ঘিরে। সেখানে নির্মাণকাজ চলমান থাকা অবস্থাতেই প্রায় ৮ কোটি টাকার আসবাবপত্রের বিল ঠিকাদারকে পরিশোধ করা হয়, যদিও তখনও মালামাল বুঝে পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, কয়েকটি বড় কার্যাদেশে নির্ধারিত অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ না করলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঠিকাদার হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। এছাড়া কক্সবাজার, যশোর, পাবনা ও নোয়াখালীর সরকারি উন্নয়ন তহবিলের জিডিএফ-২৫, জিডিএফ-২৬, জিডিএফ-২৮ ও জিডিএফ-২৯ নম্বর প্যাকেজ প্রশাসনিক অনুমোদন বা ডিপিপি সংশোধন ছাড়াই পরিবর্তন করা হয়েছে বলে অভিযোগ। একই সঙ্গে ২০১৬ ও ২০১৯ সালের সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে অধিকাংশ দরপত্রে বিধি অনুযায়ী মূল্যায়ন কমিটি গঠন না করার অভিযোগও রয়েছে। প্রায় সব দরপত্রেই একই ধরনের কমিটি দায়িত্ব পালন করেছে। কমিটির সভাপতি ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজেদুল ইসলাম, সদস্যসচিব ছিলেন একজন সহকারী প্রকৌশলী, পর্যালোচনায় ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল কালাম এবং অনুমোদন দেন গণপূর্ত ই/এম পিএন্ডডি জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আলমগীর খাঁন।

সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, গুডস ক্যাটাগরির কাজকে ওয়ার্কস হিসেবে প্রকাশ করলে প্রতিযোগিতার ধরন পরিবর্তিত হয়। এতে প্রকৃত আসবাবপত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে সীমিতসংখ্যক নির্মাণ ঠিকাদার অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। একই সঙ্গে যোগ্যতার শর্ত পরিবর্তনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া, ব্যয়ের প্রাক্কলন বৃদ্ধি এবং পুরো দরপত্র প্রক্রিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়ে পড়ে।

অভিযোগ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল কালাম বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমি কিছু জানি না। যারা কেনাকাটা করেছে, তাদের জিজ্ঞাসা করুন।”

অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আলমগীর খাঁন বলেন, “এ বিষয়ে আমার জানা নেই। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক বিষয়টি ভালো বলতে পারবেন।”

প্রকৌশলী এস এম ফজলুল কবিরের ভাষ্য, এ ধরনের দরপত্র টেকনিক্যাল রেসপনসিভনেস পর্যায়েই বাতিল হওয়ার কথা। তাঁর দাবি, ক্রয়কারী সংস্থা অসৎ উদ্দেশ্যে গুডস ক্যাটাগরির কাজকে ওয়ার্কস হিসেবে উপস্থাপন করেছে। আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে সংশ্লিষ্টরা একাধিক ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন করেছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ