
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের নির্দেশনার আলোকে বিপিসির আওতাধীন তেল বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি কার্যক্রম শুরু হলেও যমুনা অয়েল পিএলসিতে তা নিয়ে বৈষম্য ও দ্বৈতনীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের দাবি, একই ডিপোতে দীর্ঘদিন কর্মরত অনেককে বদলির আওতায় না এনে নির্বাচিত কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে স্থানান্তর করা হয়েছে, যা নিয়ে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স-৪ শাখা থেকে গত ১৩ এপ্রিল জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, বিপিসির আওতাধীন পদ্মা অয়েল পিএলসি, যমুনা অয়েল পিএলসি এবং মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় একই কর্মস্থলে তিন বছরের বেশি সময় কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্যত্র বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গত ১১ জুন যমুনা অয়েল পিএলসির ৬৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়।
তবে অভিযোগ উঠেছে, বদলির ক্ষেত্রে নির্ধারিত নীতিমালা সমানভাবে অনুসরণ করা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তিন বছরের কম সময় কর্মরত অনেকের নাম বদলির তালিকায় থাকলেও এক যুগ বা তারও বেশি সময় ধরে একই ডিপোতে কর্মরত বহু কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে বদলি করা হয়নি।
দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে বহাল থাকার অভিযোগ
প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন সূত্রের দাবি, চট্টগ্রাম টার্মিনাল অফিস, ভৈরব বাজার ডিপোসহ বিভিন্ন স্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম বদলির তালিকায় স্থান পায়নি। অভিযোগকারীদের মতে, তাদের অনেকেই এক দশকেরও বেশি সময় ধরে একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, এসব ব্যক্তির মধ্যে কেউ কেউ অতীতে শ্রমিক রাজনীতি ও কর্মচারী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। যদিও এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
প্রভাবশালী সিবিএ নেতাকে ঘিরে নানা অভিযোগ
একাধিক সূত্রের দাবি, বর্তমানে যমুনা অয়েল কোম্পানি শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বিশ্বাস প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করছেন। যদিও তিনি খুলনার দৌলতপুর ডিপোতে সিনিয়র অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত, তবুও প্রশাসনিক নানা বিষয়ে তার প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একই ডিপোতে কর্মরত থাকা সত্ত্বেও তিনি বদলির আওতায় আসেননি। এছাড়া তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এবং বিভিন্ন অনিয়মে সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দেলোয়ার হোসেন বিশ্বাস বলেন, তাকে নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন চাকরি করার বিষয়ে তিনি দাবি করেন, নির্বাচিত সিবিএ নেতাদের বদলির ক্ষেত্রে কিছু আইনগত জটিলতা রয়েছে।
আইনগত ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের আইন শাখা থেকে জারি করা এক চিঠিতে শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৮৭ ধারার বিধান জ্বালানি খাতের এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। ফলে সিবিএ নেতাদের বদলিতে আইনগত বাধা থাকার যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডে কর্মরত কয়েকজন সিবিএ নেতাকে চলতি বছরের মে মাসে বদলি করা হলেও যমুনা অয়েলে একই নীতি অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ
প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী অভিযোগ করেছেন, বদলি কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে প্রভাব খাটানো এবং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে কিছু ব্যক্তিকে বদলির বাইরে রাখার চেষ্টা হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত হয়নি।
তাদের মতে, একই নীতিমালা সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হলে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও শক্তিশালী হতো।
স্বচ্ছ তদন্তের দাবি
এদিকে যমুনা অয়েলের অভ্যন্তরে বদলি কার্যক্রম নিয়ে চলমান বিতর্কের প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তাদের মতে, কারা কতদিন একই কর্মস্থলে কর্মরত রয়েছেন, কী মানদণ্ডে বদলি করা হয়েছে এবং কেন কিছু ব্যক্তি বদলির বাইরে থাকলেন—এসব বিষয় পর্যালোচনা করে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও আস্থা বৃদ্ধি পাবে।

