
নরসিংদী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রাজস্ব আত্মসাৎ: সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার নীহার রঞ্জন বিশ্বাস বরখাস্ত
নরসিংদী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার নীহার রঞ্জন বিশ্বাসকে চাকরি থেকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করেছে সরকার। ‘অসদাচরণ’ ও ‘দুর্নীতি’র অভিযোগে বিভাগীয় মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে উঠে এসেছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে নীহার রঞ্জন বিশ্বাস সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা থাকা ২ কোটি ৭০ লাখ ১২ হাজার ৯৮২ টাকা আত্মসাৎ করেন।
যেভাবে আত্মসাতের ঘটনা ঘটে
মামলার এজাহার ও তদন্ত সূত্রে জানা যায়, নরসিংদী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল নিবন্ধনের সময় উৎসে কর, স্থানীয় সরকার কর, রেজিস্ট্রেশন ফি এবং স্ট্যাম্প ডিউটি বাবদ আদায়কৃত অর্থ দৈনিক ভিত্তিতে পৃথক রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করা হতো।
তবে অভিযোগ অনুযায়ী, দিন শেষে হিসাব প্রস্তুতের সময় প্রকৃত আদায়ের তুলনায় কম অঙ্ক দেখিয়ে ব্যাংকে কম অর্থ জমা দেওয়া হতো। যোগফল ও হিসাবের কারসাজির মাধ্যমে ধাপে ধাপে সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের ঘটনা ঘটে।
দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত এই পদ্ধতিতে মোট ২ কোটি ৭০ লাখ ১২ হাজার ৯৮২ টাকা আত্মসাৎ করা হয়।
তদন্ত ও মামলা
২০২২ সালের ২৩ আগস্ট একটি জাতীয় অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে। এর আগে ২০২১ সালের ৩০ মার্চ দুদকের একটি এনফোর্সমেন্ট টিম নরসিংদী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অভিযান পরিচালনা করে।
দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ দুদকের গাজীপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. সাইদুজ্জামান বাদী হয়ে নীহার রঞ্জন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা দায়ের করেন।
তদন্তে আরও অভিযোগ ওঠে, এ ঘটনায় অফিসের কয়েকজন কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। তবে মামলায় কাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে, তা আদালত ও তদন্ত সংস্থার নথির ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে।
বিভাগীয় ব্যবস্থা
দুর্নীতির অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় নীহার রঞ্জন বিশ্বাসকে প্রথমে সাময়িক বরখাস্ত করে নিবন্ধন অধিদপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। পরে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয় এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
তার জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় এবং সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মতামতের ভিত্তিতে ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’ অনুযায়ী তাকে চাকরি থেকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করা হয়।
অন্যান্য কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
এদিকে নরসিংদী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের আরও কিছু সাবেক কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, রাজস্ব অনিয়মের অভিযোগে অন্যদের বিরুদ্ধেও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
তবে এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি এবং কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আদালত বা তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তা অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হবে।
জবাবদিহিতার দাবি
সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী কর্মীরা বলছেন, সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের মতো ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা প্রশাসনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে এ ধরনের অনিয়মে অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।

