
একসময় দেশের সিমেন্ট শিল্পে সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত বরিশালভিত্তিক অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেড বর্তমানে নানা অভিযোগ ও আর্থিক সংকটের কারণে আলোচনায় এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকি, ব্যাংক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা, অর্থপাচার, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বকেয়া রাখা, ডিলারদের অর্থ আটকে রাখা এবং উৎপাদন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে।
খান সন্স ভবন, ৫১ কাঠপট্টি রোডে করপোরেট অফিস এবং রূপাতলীতে কারখানা নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে চরম আর্থিক সংকটে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, ব্যাংক ঋণ খেলাপির কারণে আর্থিক চাপ বেড়েছে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া রয়েছে।
৪০ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ, তদন্তে ভ্যাট গোয়েন্দা
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রায় ৪০ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি এবং সরকারের কাছ থেকে অতিরিক্ত রেয়াত সুবিধা গ্রহণের অভিযোগে অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেডের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তলব করেছে কাস্টমস ও ভ্যাট কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং ভ্যাট অডিট, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে। অভিযোগের মধ্যে শুল্ক ফাঁকি, ভ্যাট জালিয়াতি এবং অর্থপাচারের বিষয়ও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধান
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিদেশে নাগরিকত্ব গ্রহণ, অর্থপাচার এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের সঙ্গে জড়িত। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে জানা গেছে। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির কাছে দুদকের পক্ষ থেকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
বিদেশে সম্পদ গড়ার অভিযোগ
প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থপাচার এবং দুবাই, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ব্যাংক ঋণ বকেয়া, বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে ব্যর্থতা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বকেয়া এবং ডিলার-রিটেইলারদের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ গ্রহণের পর পণ্য সরবরাহ না করার অভিযোগও রয়েছে।
অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেডের একটি সূত্রের দাবি, চেয়ারম্যান জুলিয়া রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিকা রহমান এবং পরিচালক রিফাত রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও তদন্তের চাপ বাড়ায় তারা বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে এ বিষয়ে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঋণ সংকট ও উৎপাদন কার্যক্রমে স্থবিরতা
জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন সময়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি, মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি এবং ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি থেকে বড় অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করে। অভিযোগ রয়েছে, ঋণের অর্থ যথাযথভাবে উৎপাদন খাতে ব্যবহার না হওয়ায় বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়েছে।
সূত্রগুলো জানায়, কাঁচামাল সংকট, এলসি খুলতে অক্ষমতা এবং আর্থিক দুরবস্থার কারণে কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন বেতন বকেয়া থাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষও বাড়ছে।
জাল কাগজপত্র তৈরির অভিযোগ
নতুন করে ব্যাংক ঋণ গ্রহণের উদ্দেশ্যে কিছু জমির জাল কাগজপত্র প্রস্তুতের চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকলেও বিষয়টি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই হয়নি।
তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থার দাবি
সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, চেয়ারম্যান জুলিয়া রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিকা রহমান এবং পরিচালক রিফাত রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। তাদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা, দুদক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত তদন্তেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি মনে করছেন, অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে এটি দেশের শিল্প ও ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তাদের মতে, অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেডকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকটের বিষয় নয়; বরং করপোরেট সুশাসন, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনছে।

