
এসিএম নিউজ, ঢাকা
পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার মেয়ে আজমিনা সিদ্দিক ও ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের নামে দুটি প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির মামলায় শেখ হাসিনাকে ১০ বছর, শেখ রেহানার মেয়ে আজমিনা সিদ্দিককে ৭ বছর, ছেলে রাদোয়ান মুজিব সিদ্দিক কে সাত বছর ও শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিককে (টিউলিপ সিদ্দিক) ৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আজ সোমবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত- ৪ এর বিচারক মো. রবিউল আলম পৃথক ২ মামলার রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে দুটি মামলায় শেখ হাসিনাকে প্রত্যেকটিতে ৫ বছর করে ও টিউলিপ সিদ্দিককে প্রত্যেক মামলায় ২ বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। দুই মামলায় তারা দুজনই আসামি হওয়ায় শেখ হাসিনাকে মোট ১০ বছর ও টিউলিপ সিদ্দিককে ৪ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বিশেষ পিপি মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন দুই মামলায় পৃথক পৃথক রায় দেওয়া হয়েছে।
আজমিনার মামলায় অন্য যারা দণ্ডিত:
আজমিরা সিদ্দিকের প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির মামলায় সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিনসহ ১৪ জনকে ৫ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একজনকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
৫ বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য ১২ জন হলেন গৃহায়ন ও গণপুর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম সরকার, মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সহকারী সচিব পূরবী গোলদার, অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন-২) মো. অলিউল্লাহ, সাবেক অতিরিক্ত সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাবেক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞা , সাবেক সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) তন্ময় দাস, সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, সাবেক সদস্য (উন্নয়ন) মেজর (ইঞ্জি.) সামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরী (অব.), সাবেক পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম, সাবেক পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-২) কামরুল ইসলাম, সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি) মাজহারুল ইসলাম এবং সাবেক উপ-পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি) নায়েব আলী শরীফ।
সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ খুরশীদ আলমকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করার কারণে ও ৬০ বছরের বেশি বয়স এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে তাকে কম মেয়াদের সাজা দেওয়া হয়েছে বলে আদালত রায় উল্লেখ করেন।
গত ১৩ জানুয়ারি যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে আজমিনার মামলার রায়ের তারিখ ধার্য করা হয়। আজ বেলা ১২:১০ টার সময় রায় ঘোষণা শুরু হয়। আদালত রায়ের সংক্ষিপ্ত অংশ পড়ে শোনান।
রাদওয়ানের মামলায় অন্য যারা দণ্ডিত:
শেখ রেহানার ছেলে রাত ওয়ান মুজিব সিদ্দিকের প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির মামলায় শেখ হাসিনা, রাদওয়ান ও টিউলিপ ছাড়া সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিনসহ ১৪ জনকে ৫ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একজনকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
৫ বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য ১২ জন হলেন – গৃহায়ন ও গণপুর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম সরকার, মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সহকারী সচিব পূরবী গোলদার, সাবেক সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার,
সাবেক অতিরিক্ত সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাবেক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞা, সাবেক সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) তন্ময় দাস, সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, সাবেক সদস্য (উন্নয়ন) মেজর (ইঞ্জি.) সামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরী (অব.), সাবেক সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) ফারিয়া সুলতানা , সাবেক পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-২) শেখ শাহিনুল ইসলাম, সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি) মাজহারুল ইসলাম এবং সাবেক উপ-পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি) নায়েব আলী শরীফ।
সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ খুরশীদ আলমকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ মামলায় ও তার আদালতে আত্মসমর্পণ ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় কওমিয়াদের সাজা দেওয়া হয়েছে বলে আদালত রায়ে উল্লেখ করেন।
গত ১৮ জানুয়ারি রাদওয়ান মুজিবের মামলায় যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে আদালত রায়ের তারিখ ধার্য করেন। আজ মিনার মামলার রায় ঘোষণা শেষে সংক্ষিপ্তভাবে এই মামলার রায় ঘোষণা করা হয়।
প্রত্যেক মামলায় প্রত্যেক আসামির জরিমানা:
প্রত্যেক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে জরিমানার টাকা পরিষদে ব্যর্থ হলে প্রত্যেককে আরো ছয় মাস কারাভোগ করতে হবে বলে রায় বলা হয়েছে। প্রতি মামলায় শেখ হাসিনা সহ ১৭ জন আসামি পলাতক থাকায় তারা গ্রেপ্তার হওয়ার পর অথবা আদালতে আত্মসমর্পণ করার পর এই রায় কার্যকর হবে বলে রায়ে বলা হয়েছে। শেখ হাসিনাসহ আদালত সাজাপ্রাপ্ত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার নির্দেশ দেন।
একমাত্র আসামি আদালতে হাজির:
রায় ঘোষণার সময় কারাগারে থাকা একমাত্র আসামি রাজউকের সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ খুরশীদ আলমকে আদালতে হাজির করা হয়। রায় শেষে সাজা পরোয়ানাসহ তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে যতদিন তিনি কারা ভোগ করেছেন তা সাজার মেয়াদ থেকে বাদ যাবে বলেও আদালত রায়ে উল্লেখ করেছেন।
গত বছর ৩১ জুলাই আদালত দুটি মামলায় শেখ হাসিনাসহ অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন।
গত বছর ১২, ১৩ ও ১৪ জানুয়ারি দুর্নীতির দমন কমিশন (দুদক) শেখ হাসিনা, তাঁর পরিবারের সদস্য ও অন্যদের বিরুদ্ধে ৬টি মামলা দায়ের করে। এরমধ্যে ৪ টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। গত ২৭ নভেম্বর তিন মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। তিন মামলায় শেখ হাসিনাকে ২১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দুই মামলার একটিতে শেখ হাসিনার ছেলে জয়কে ৫ বছরের কারাদণ্ড ও আরেকটিতে মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজউকের প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত দায়িত্বে থাকা অন্যান্যদেরকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আরেকটি মামলার রায় ঘোষণা করা হয় গত ১ ডিসেম্বর। শেখ রেহানার প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির এই মামলায় শেখ হাসিনাকে ৫ বছর, শেখ রেহানাকে ৭ বছর ও টিউলিপ সিদ্দিককে ২ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়। গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজউকের প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত দায়িত্বে থাকা অন্যান্যদেরকে ৫ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
গত ২৫ মার্চ ছয় মামলায় আদালতে অভিযোগ পত্র দাখিল করে দুদক।
প্রত্যেক মামলায় প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, সরকারের সর্বোচ্চ পদে থাকাকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ওপর অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা ও তাদের ছেলেমেয়েদের বরাদ্দ পাওয়ার যোগ্য না হওয়া সত্ত্বেও অসৎ উদ্দেশ্যে পূর্বাচল আবাসন প্রকল্পের ২৭ নম্বর সেক্টরের ২০৩ নং রাস্তার ৬ প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
মামলায় আরো অভিযোগ করা হয়েছে,সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের সর্বোচ্চ পদাধিকারী ও পাবলিক সার্ভেন্ট হিসেবে বহাল থেকে তার ওপর অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করে, অপরাধজনক বিশ্বাস ভঙ্গ করে প্রকল্পের বরাদ্দ বিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত গণ কর্মচারিদের বা রাজউক কর্মচারিদের প্রভাবিত করে নিজের পরিবারের সদস্যদের প্লট বরাদ্দ দিয়েছেন। শেখ রেহানার কন্যা টিউলিপ সিদ্দিক তার মা, ভাই, বোনকে প্লট বরাদ্দে বিশেষ ক্ষমতা বলে প্রত্যক্ষ প্রভাব খাটিয়েছেন। অন্যদিকে রাজউকের প্রকল্প বরাদ্দ বিষয়ক কর্মচারিরা নিজেরা লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে নিয়ম বহির্ভূতভাবে প্লট বরাদ্দ দিয়েছেন।
আজকের রায়ে যা বলা হয়েছে:
আদালত রায়ে বলেছেন, শেখ রেহানার মেয়ে আজমিনা সিদ্দিক ও ছেলে রাদওয়ানের রাজধানীতে আবাসন সুবিধা থাকা সত্ত্বেও তাঁরা মিথ্যা হলফনামা দাখিল করে রাজউকের প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন। আর এই প্লট বরাদ্দে প্রভাব খাটিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্লট বরাদ্দ প্রক্রিয়ার সকল আইন বিধি বিধান লংঘন করে ক্ষমতার অপব্যবহার করে শেখ হাসিনা তার বোনের ছেলে-মেয়েকে প্লট বরাদ্দ দিতে রাজউককে প্রভাবিত করেছেন। তিনি ফৌজদারি অসদাচরণ করেছেন বলে সাক্ষ্য প্রমাণে প্রমাণিত হয়েছে অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। আজমিনা ও রাদওয়ান প্লট বরাদ্দ নিয়ে একই ধারায় ও দন্ডবিধির ১০৯ ধারায় অপরাধ করেছেন। টিউলিপ সিদ্দিক বিদেশে থেকে ফোন করে তার ভাই-বোনের নামে প্লট বরাদ্দ নিতে প্রভাব খাটিয়েছেন বলে সাক্ষ্য প্রমাণে প্রমাণিত হয়েছে। ভাই-বোনের প্লট বরাদ্দে সহযোগিতার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে দন্ডবিধির ১০৯ ধারায় সাজা দিয়েছেন আদালত। অন্য আসামিরা সরকারি কর্মচারি হয়ে সরকারি কর্মচারি আইন এবং বরাদ্দ সংক্রান্ত আইন ও বিধি-বিধান লংঘন করেছেন। তারা সকলেই ফৌজদারি অসদাচরণ করেছেন বলে প্রমাণ হয়েছে। এদের সবাইকেও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ও দন্ডবিধির ১০৯ ধারায় সাজা দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে দুটি অপরাধে মৃত্যুদণ্ড ও একটি অপরাধে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গত বছর ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন ট্রাইবুনাল এই রায় ঘোষণা করেন।

