সোমবার, মে ৪, ২০২৬

লন্ডনে বিলাসবহুল সম্পদ, দেশে হাজার কোটি টাকার ঋণ—শওকত আজিজ রাসেলকে ঘিরে প্রশ্ন

লন্ডনের অভিজাত রিজেন্ট পার্ক এলাকার নীরব আবাসিক পরিবেশে মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের বাড়ি, আর বাংলাদেশে বিপুল অংকের ঋণ খেলাপি—এই বৈপরীত্য ঘিরে আলোচনায় উঠে এসেছে আম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শওকত আজিজ রাসেল-এর আর্থিক কর্মকাণ্ড।

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, তার মালিকানাধীন আম্বার ওভারসিজ লিমিটেড-এর মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে গড়ে তোলা হয়েছে বাণিজ্যিক ভবন ও বিলাসবহুল আবাসনের ব্যবসা। একই সময়ে দেশে একাধিক ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে তিনি বড় ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আইনি জটিলতা ও আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকগুলোর অর্থ পুনরুদ্ধার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত রয়েছে।

যুক্তরাজ্যে সম্পদের বিস্তার

নথিপত্র অনুযায়ী, লন্ডনের রিজেন্ট পার্কের নিকটে একটি বিলাসবহুল বাড়ির মালিক শওকত আজিজ। তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী। তার প্রতিষ্ঠানের নামেও সেখানে বিপুল সম্পত্তির তথ্য পাওয়া গেছে।

২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত আম্বার ওভারসিজ লিমিটেড (রেজিস্ট্রেশন নম্বর: ০৭৯৩৫৯৬২) লন্ডনের ২৮১এ ব্রিক লেন ঠিকানায় নিবন্ধিত। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯ ও ২০২৫ সালে নবায়ন করা হয় এবং এর শতভাগ শেয়ারের মালিক তিনি নিজেই।

প্রতিষ্ঠানটির নামে লন্ডনের ২৭৫ বেথনাল গ্রিন রোডে একটি বহুতল আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন কেনা হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৮.৫ মিলিয়ন ব্রিটিশ পাউন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় আনুমানিক ১৪১ কোটি ২৫ লাখ টাকা)। ভবনটির নিচতলা ভাড়া দেওয়া হয়েছে টেসকো এক্সপ্রেস-এর কাছে এবং অন্যান্য ইউনিট বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দেওয়া রয়েছে। এখান থেকে মাসিক প্রায় ৬৫ লাখ টাকা ভাড়া আদায় করা হয়।

এ ছাড়া ৩৩ চেস্টার ক্লোজ নর্থ রোডে প্রায় ৩ মিলিয়ন পাউন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা) মূল্যের আরেকটি বাড়ির মালিকানাও রয়েছে তার। বাড়িটির একটি অংশে পরিবারের সদস্যরা বসবাস করেন এবং বাকি অংশ ভাড়া দেওয়া। লন্ডনে আরও একাধিক সম্পদের তথ্য পাওয়া গেলেও সব নথি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।

উত্তরাধিকার ও ব্যবসা সম্প্রসারণ

পারটেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা এম এ হাশেম-এর সন্তান শওকত আজিজ রাসেল উত্তরাধিকারসূত্রে আম্বার অংশটি পান। এই গ্রুপের অধীনে বস্ত্র, সুতা, পার্টিকেল বোর্ড, কাগজ ও পর্যটনসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ রয়েছে। পরবর্তীতে তিনি আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেও এর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সীমিত বা কাগুজে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঋণ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ

অনুসন্ধান বলছে, ২০১১ সালের দিকে তিনি একাধিক ব্যাংক থেকে বিপুল ঋণ গ্রহণ করেন, যার কিছু প্রতিষ্ঠান কাগজে থাকলেও বাস্তবে সক্রিয় নয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব ঋণের অর্থ বিদেশে সরিয়ে নিয়ে যুক্তরাজ্যে সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে।

বিভিন্ন সময়ে সরকারি-বেসরকারি ১৪টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি ১ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেন। এর মধ্যে ৫২১ কোটি টাকা বকেয়া হয়ে পড়ে এবং বর্তমানে মোট স্থিতি প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটিতে দাঁড়িয়েছে।

ঋণ পরিশোধে চাপ বাড়লে তিনি উচ্চ আদালতে রিট করে স্থগিতাদেশ নেন, ফলে ব্যাংকের আদায় কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। সম্প্রতি কিছু স্থগিতাদেশ বাতিল হলেও ব্যাংকগুলো এখনও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হিমশিম খাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

আদালতের জরিমানা

গত বছর ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) সংক্রান্ত একটি রিটে অসত্য তথ্য দেওয়ার অভিযোগে আদালত শওকত আজিজসহ ছয়জনকে ১৫ লাখ টাকা জরিমানা করেন। অভিযোগ ছিল, রিট দাখিলের সময় উপস্থিতি সংক্রান্ত তথ্য মিথ্যা দেওয়া হয়েছিল।

ব্যাংক খাতের উদ্বেগ

একটি ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, ঋণ খেলাপি ও অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছেন, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, আম্বার গ্রুপের ব্যবসার আকারের তুলনায় ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। গ্রুপটির ডেনিম ও কটন মিল প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ায় ঋণের কিস্তি পরিশোধ অনিয়মিত হয়ে পড়ছে। নগদ প্রবাহের তুলনায় দায় বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে এবং কিছু কেবল কাগজে-কলমে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, স্টোলেন অ্যাসেট রিকোভারি টাস্কফোর্সের মাধ্যমে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রমাণ পাওয়া গেলে শওকত আজিজের ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আদালতের স্থগিতাদেশ থাকলে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হলেও তা বাতিলের জন্য ব্যাংকগুলো আবেদন করতে পারে।

রিসোর্ট ও ভূমি দখলের অভিযোগ

গাজীপুরের শালবন এলাকায় শওকত আজিজের মালিকানাধীন ভাওয়াল রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। স্থানীয় সূত্র বলছে, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি কেনার পর আশপাশের প্রায় ৬ একর ৭০ শতাংশ বনভূমি দখল করে রিসোর্টটি গড়ে তোলা হয়। এছাড়া স্থানীয়দের কাছ থেকে প্রায় ৩ একর কৃষিজমি দখলের অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ-এর প্রভাব ব্যবহার করে এসব দখল কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলাও হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার রাতে জেলা প্রশাসনের অভিযানে রিসোর্ট থেকে বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি মদ ও মাদক উদ্ধার করা হয় এবং ছয়জনকে আটক করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, রিসোর্টটি নিয়মিত মাদক পার্টির জন্য ভাড়া দেওয়া হতো।

সংগঠন নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন

বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)-এর সভাপতি পদেও নির্বাচন ছাড়াই ২০২৫-২৭ মেয়াদে দায়িত্ব নেন শওকত আজিজ। অভিযোগ রয়েছে, আগের সভাপতিকে সরিয়ে তিনি এই পদে আসীন হন।

অভিযোগ অস্বীকার

অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে চেষ্টা করা হলেও শওকত আজিজের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। তবে তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত ঋণ, বিদেশে সম্পদ বা অর্থ পাচারের অভিযোগ সঠিক নয় এবং তিনি দেশেই অবস্থান করছেন।

এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ ঘিরে দেশের ব্যাংকিং খাত, সম্পদ পাচার এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ