বুধবার, জুলাই ২৯, ২০২৬

ডিএইতে নিয়োগ-বদলি বাণিজ্যের অ’ভিযোগ, তো’পে’র মুখে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)-এর প্রশাসন শাখায় নিয়োগ, বদলি, কমিশন বাণিজ্য এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) হাবিবউল্লাহ এবং সাময়িক বরখাস্ত সাবেক উপপরিচালক (প্রশাসন) মুহাম্মদ মাহবুবুর রশিদ। অভিযোগ রয়েছে, তাদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের বিভিন্ন বরাদ্দের অর্থের একটি বড় অংশ ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ কাজে সাবেক উপপরিচালক লিসাসা ও হাসিবুল হাসানসহ কয়েকজন কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে মাহবুবুর রশিদ সাময়িক বরখাস্ত হলেও তিনি এখনও প্রশাসন শাখার বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছেন এবং পরিচালক হাবিবউল্লাহর সঙ্গে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে দ্রুততার সঙ্গে ৯১ জন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এবং ৩৮ জন ড্রাইভার নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। পরবর্তীতে পরিচালক (প্রশাসন) হাবিবউল্লাহ ওই নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগদান সম্পন্ন করেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা পদে চাকরি দেওয়ার নামে প্রার্থীপ্রতি ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা এবং ড্রাইভার পদে ৬ থেকে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নিয়োগ প্রক্রিয়ার সময় তৎকালীন মহাপরিচালক সাইফুল আলম দায়িত্বে থাকলেও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁর কার্যকর ভূমিকা ছিল না। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নিয়োগসংক্রান্ত অধিকাংশ সিদ্ধান্ত প্রশাসন শাখার প্রভাবশালী কর্মকর্তারাই নিয়ন্ত্রণ করতেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, গত ১২ মে ২০২৫ তারিখে মহাপরিচালকের স্বাক্ষরিত এক পত্রের মাধ্যমে সাবেক উপপরিচালক মাহবুবুর রশিদকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব না দিয়ে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করেন। একই সঙ্গে পরিচালক হাবিবউল্লাহর অবসর-পূর্ব ছুটিতে (পিআরএল) যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসায় বদলি ও কমিশন বাণিজ্য আরও বেড়ে গেছে বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নিয়োগপ্রার্থী সংগ্রহ এবং অর্থ লেনদেনের দায়িত্বে কয়েকজন ড্রাইভারকে ব্যবহার করা হতো। অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত সাবেক উপপরিচালক মাহবুবুর রশিদের ড্রাইভার রাজ্জাক, কুষ্টিয়ায় কর্মরত ড্রাইভার আলমগীর হোসেন, আবুল কালাম, নজরুল, হুমায়ুন কবির লিটনসহ আরও কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ, প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রক্সির ব্যবস্থা এবং লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় প্রভাব বিস্তার করে পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া হতো।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, ঘুষের বিনিময়ে চাকরি পাওয়া কয়েকজন নিয়োগপ্রাপ্তের কথোপকথনের অডিও রেকর্ডও সংরক্ষিত রয়েছে। পাশাপাশি অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসন শাখার উচ্চমান সহকারী আমির হামজা এবং প্রধান সহকারী হাবিবুর রহমানের মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নয়ন বরাদ্দের বিপরীতে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন আদায় করা হতো। বদলি বাণিজ্য, মেরামত ও সংস্কার, কেনাকাটা, ভুয়া বিল-ভাউচার এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রশাসন শাখার অধীন ৮টি উইং, ১৪টি অঞ্চল, ১৮টি কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (এটিআই) এবং ৭২টি হর্টিকালচার সেন্টারের বিভিন্ন উন্নয়ন ও সংস্কার কাজেও অনিয়ম এবং কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়োগ পাওয়া ড্রাইভার ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলে পুরো নিয়োগ বাণিজ্যের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে পরিচালক (প্রশাসন) হাবিবউল্লাহর সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে খুদে বার্তায় তিনি দাবি করেন, তাঁর দায়িত্বকালে কোনো ব্যক্তিগত কর্মকর্তা বা ড্রাইভার নিয়োগ হয়নি এবং এ বিষয়ে প্রকাশিত তথ্য ভুল।

অন্যদিকে, সাময়িক বরখাস্ত সাবেক উপপরিচালক মাহবুবুর রশিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তাঁর দায়িত্বকালে কোনো নিয়োগ হয়নি; বরং নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালক হাবিবউল্লাহর দায়িত্বকালে সম্পন্ন হয়েছে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ