
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের নিয়োগ কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অনিয়ম, ঘুষ লেনদেন এবং নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট নিয়োগ প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. শহীদ আতাহার হোসেন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি নেটওয়ার্ক চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করে নিয়োগের আশ্বাস দিয়ে আসছিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) হিসেবে নিয়োগ কমিটির সভাপতির দায়িত্বে থাকায় প্রশাসনিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়। এই নেটওয়ার্কে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মরত কয়েকজন ফায়ারফাইটার ও ড্রাইভারকে সম্পৃক্ত করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হতো এবং নিয়োগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
সম্প্রতি সিরাজগঞ্জের পাওয়ার প্লান্ট ফায়ার স্টেশনের ড্রাইভার শিহাব উদ্দিনের মৃত্যুর পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। অভিযোগকারীদের দাবি, নিয়োগ-সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেন এবং প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ায় তিনি দীর্ঘদিন মানসিক চাপে ছিলেন। ভুক্তভোগী আলমের দাবি, শিহাব উদ্দিনের মৃত্যুর সঙ্গে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগের সম্পর্ক রয়েছে। এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শিহাব উদ্দিনের মৃত্যুসহ পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, নিয়োগ সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে সিরাজগঞ্জের পাওয়ার প্লান্ট ফায়ার স্টেশনের ড্রাইভার শিহাব উদ্দিনও যুক্ত ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল ফায়ার স্টেশনের ড্রাইভার মাহমুদুল হাসানের মাধ্যমে পরিচালক শহীদ আতাহার হোসেনের কাছে ৮৫ লাখ টাকা পৌঁছে দেওয়া হয়। তবে অর্থ গ্রহণের পরও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
শিহাব উদ্দিনের স্ত্রী লাবনী আক্তার দাবি করেন, তাঁর স্বামী ড্রাইভার মাহমুদুল হাসানের মাধ্যমে পরিচালক শহীদ আতাহার হোসেনকে ৮৫ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। নিয়োগ কার্যক্রম সফল না হওয়ায় মানসিক চাপে পড়ে তাঁর স্বামী আত্মহত্যা করেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি অনুরোধ জানান, এ বক্তব্য প্রকাশ না করার জন্য, কারণ এতে তাঁর স্বামীর পেনশন জটিলতায় পড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) হওয়ার আগে শহীদ আতাহার হোসেন ফায়ার সার্ভিসের একটি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসন ও অর্থ পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি অধিদপ্তরের প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। তাঁর বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল বলে একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কার্যকর কোনো তদন্ত বা দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষায় প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। বিভিন্ন জেলার প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিয়োগের নিশ্চয়তা দিয়ে অর্থ আদায় করা হতো। অভিযোগ রয়েছে, ঘুষের টাকা ফেরত দিতে না পারায় শিহাব উদ্দিনের মতো আরও অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী চরম মানসিক চাপে পড়েছেন।
এদিকে জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল ফায়ার স্টেশনের ড্রাইভার মাহমুদুল হাসান ঘুষের অর্থ লেনদেনের বিষয়ে বলেন, “বড় স্যার টাকা নিয়েছেন, এটা সত্যি। তবে এ বিষয়ে কিছু বলা ঠিক হবে না। শিহাবের জীবন শেষ হয়েছে, আর আমি চাকরি হারাব।”

