সোমবার, জুন ১৫, ২০২৬

তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে ‘উমেদার’ চক্রের দৌরাত্ম্য, ঘু’ষ বাণিজ্যের অ’ভিযোগে তোল

ঢাকার তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের ১১টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে তথাকথিত ‘উমেদার’ চক্রের দৌরাত্ম্য, ঘুষ বাণিজ্য এবং দলিল নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি কোনো পদ বা নিয়োগ না থাকা সত্ত্বেও এই উমেদাররা বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করে দলিল নিবন্ধন কার্যক্রমে অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দলিল নিবন্ধন, নাম সংশোধন, নথি যাচাই ও বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে নিয়মবহির্ভূত অর্থ আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় অর্থ প্রদান না করলে বিভিন্ন অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা, নথিতে ত্রুটি দেখানো কিংবা প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার ঘটনা ঘটছে।

উমেদারদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

ঐতিহাসিকভাবে ‘উমেদার’ শব্দটি চাকরি-প্রত্যাশী বা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে তাদের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু উমেদার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করে অনানুষ্ঠানিকভাবে মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব পালন করছেন।

সম্প্রতি বিভিন্ন অনুসন্ধানী তথ্য ও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, রাজধানীর কয়েকটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে উমেদারদের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অবৈধ লেনদেন সংঘটিত হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।

বিভিন্ন অফিসে অনিয়মের অভিযোগ

মোহাম্মদপুর, খিলগাঁও, ঢাকা সদর, উত্তরা, পল্লবী, ধানমন্ডি, বাড্ডা ও গুলশানসহ একাধিক সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রভাবশালী উমেদারদের মাধ্যমে ফাইল নিয়ন্ত্রণ, দলিল নিবন্ধনে অনিয়ম এবং ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে উমেদাররা সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে বিভিন্ন জটিলতা নিরসনের আশ্বাস দেন। আবার কোথাও কোথাও দলিল নিবন্ধনের আগে অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন

বিভিন্ন সূত্রের দাবি, কয়েকজন উমেদার অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট এবং ব্যবসায়িক বিনিয়োগের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এসব সম্পদের উৎস ও মালিকানার তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

ভূমি আইন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কোনো অনানুষ্ঠানিক ব্যক্তি যদি প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করেন, তবে তা সুশাসন ও জবাবদিহিতার জন্য উদ্বেগজনক।

তাদের মতে, দলিল নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগী ও অনিয়মের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, উমেদারদের বিষয়ে অতীতেও বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। তবে লোকবল সংকট এবং দীর্ঘদিনের প্রচলিত ব্যবস্থার কারণে বিষয়টি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।

তাদের দাবি, কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। একই সঙ্গে দপ্তরের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

তদন্তের দাবি

সুশীল সমাজ ও সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, উমেদারদের ভূমিকা, তাদের সম্পদের উৎস, দলিল নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য অনিয়ম এবং ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।

তাদের মতে, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে নিবন্ধন সেবার প্রতি জনসাধারণের আস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ