সোমবার, জুন ১৫, ২০২৬

অলিম্পিক সিমেন্টে উৎপাদন বন্ধ: ঋণ, অর্থপা’চার ও বিদেশে সম্পদের অ’ভিযোগে তোলপাড়

অলিম্পিক সিমেন্টের উৎপাদন বন্ধ: ঋণ সংকট, শ্রমিক পাওনা ও অর্থপাচারের অভিযোগে নতুন প্রশ্ন

বরিশাল অফিস: দেশের সিমেন্ট শিল্পের পরিচিত প্রতিষ্ঠান অলিম্পিক সিমেন্ট লিমিটেডের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধের ঘোষণার পর প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থা, ব্যাংক ঋণ, শ্রমিকদের পাওনা এবং বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যাংক ঋণের অপব্যবহার, ভ্যাট ও শুল্ক অনিয়ম, বিদেশে অর্থ স্থানান্তর এবং বিদেশে সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর একটি অংশ বর্তমানে বিভিন্ন সংস্থার অনুসন্ধান ও যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে বলে জানা গেছে।

উৎপাদন বন্ধের কারণ কী?

অলিম্পিক সিমেন্ট কর্তৃপক্ষ উৎপাদন বন্ধের কারণ হিসেবে কাঁচামাল সংকট, ঋণের চাপ, এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলার জটিলতা এবং দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক ক্ষতির কথা উল্লেখ করেছে।

তবে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সংকটের পেছনে কেবল ব্যবসায়িক লোকসান নয়, দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিয়ম, ঋণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগও ভূমিকা রেখেছে।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিতভাবে ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধে হিমশিম খেতে শুরু করে। একই সময়ে বাজার থেকে অগ্রিম অর্থ সংগ্রহ, অতিরিক্ত কমিশনের প্রতিশ্রুতি এবং স্থানীয় উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহের মাধ্যমে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করা হয়।

বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগ

একাধিক সূত্রের দাবি, প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান জুলিয়া রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিকা রহমান এবং পরিচালক রিফাত রহমানের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ স্থানান্তর ও সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, দুবাই, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে বিভিন্ন ব্যবসা, আবাসিক সম্পত্তি এবং বিনিয়োগে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো কোনো তদন্তকারী সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।

এলসি লেনদেন ও ওভার-ইনভয়েসিংয়ের অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র অভিযোগ করেছে, বিদেশে নিবন্ধিত কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি এবং এলসি লেনদেনের ক্ষেত্রে পণ্যের মূল্য অতিরিক্ত দেখিয়ে (ওভার-ইনভয়েসিং) অর্থ বিদেশে স্থানান্তর করা হয়েছে।

সূত্রগুলোর দাবি, সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থাগুলো বিষয়টি যাচাই করছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সম্ভব নয়।

ভ্যাট ও শুল্ক অনিয়মের অভিযোগ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) অধীন কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং ভ্যাট অডিট ও গোয়েন্দা বিভাগ প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে উত্থাপিত ভ্যাট ও শুল্কসংক্রান্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি অতিরিক্ত রেয়াত সুবিধা গ্রহণ এবং বিপুল অঙ্কের ভ্যাট ফাঁকির সঙ্গে জড়িত। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিতে কোম্পানিকে তলব করা হয়েছে বলেও সূত্রগুলোর দাবি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ

সম্প্রতি একজন প্রবাসী বাংলাদেশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ কাঠামোয় পরিবর্তনের পর বিদেশে সম্পদ অর্জন, নাগরিকত্ব গ্রহণ এবং অর্থ স্থানান্তরের ঘটনা ঘটেছে।

অভিযোগকারীর দাবি, এসব কার্যক্রমে কোম্পানির তহবিল ও ব্যাংক ঋণের অর্থ ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে। তবে এসব অভিযোগও তদন্তাধীন রয়েছে।

কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ

কোম্পানির কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ স্থানান্তরে সহায়তার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দুবাই, শারজাহ ও নিউইয়র্কে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কিছু কর্মকর্তা জড়িত থাকতে পারেন।

তবে এ বিষয়ে কোনো তদন্তকারী সংস্থা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে দায়ী করেনি কিংবা অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেনি।

ব্যাংক ঋণের চাপ

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিভিন্ন ব্যাংকের বিপুল ঋণ বকেয়া, নতুন এলসি খুলতে অক্ষমতা এবং কাঁচামাল আমদানিতে জটিলতার কারণে উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আর্থিক সংকট এবং কার্যকর পুনর্গঠন পরিকল্পনার অভাব প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

শ্রমিকদের অনিশ্চয়তা

উৎপাদন বন্ধের ঘোষণার পর শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। শ্রমিক প্রতিনিধিদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েকশ মানুষ কর্মরত রয়েছেন, যাদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে।

তারা বকেয়া বেতন-ভাতা, চাকরির নিরাপত্তা এবং সম্ভাব্য মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষার দাবি জানিয়েছেন।

তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে যেসব প্রশ্ন

অলিম্পিক সিমেন্টের উৎপাদন বন্ধের ঘটনা এখন কেবল একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকটের বিষয় নয়; এটি ব্যাংকিং খাত, করপোরেট সুশাসন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

তদন্ত সংস্থাগুলোর সামনে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে—

  • উৎপাদন বন্ধের পেছনে প্রকৃত কারণ কী?
  • ব্যাংক ঋণের অর্থ কীভাবে ব্যয় হয়েছে?
  • এলসি লেনদেনে কোনো অনিয়ম বা ওভার-ইনভয়েসিং হয়েছে কি না?
  • ভ্যাট ও শুল্কসংক্রান্ত অভিযোগের ভিত্তি কতটা শক্তিশালী?
  • শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা কীভাবে পরিশোধ করা হবে?
  • অর্থপাচারের অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে?

সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং অন্যান্য তদন্তকারী সংস্থার চূড়ান্ত অনুসন্ধান প্রতিবেদনের ওপর।

দেশের শিল্পখাতের অন্যতম আলোচিত এই ঘটনাটি ইতোমধ্যে করপোরেট জবাবদিহিতা, ব্যাংক ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রক তদারকি নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ