
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে পদায়ন পেতে ৬৯ কোটি টাকার আর্থিক চুক্তিতে জড়ানোর অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কন্ট্রোলার অব স্টোর্স এবং বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ২৮তম ব্যাচের উপসচিব মো. সালাহউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে। অভিযোগের সমর্থনে একটি লিখিত নথি প্রকাশ্যে আসার পর প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও ফাঁস হওয়া বলে দাবি করা নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, কাঙ্ক্ষিত পদায়ন নিশ্চিত করতে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আর্থিক চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। নথিতে পদায়নের জন্য ৩০ কোটি টাকা ঘুষ হিসেবে ব্যবস্থাপনার কথা উল্লেখ রয়েছে। পদায়ন পাওয়ার পর ওই অর্থের দ্বিগুণ ৬০ কোটি টাকা এবং সার্ভিস চার্জ বাবদ আরও ৯ কোটি টাকা দেওয়ার শর্তে সম্মতির কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে ৬৯ কোটি টাকা পরিশোধের বিষয়ে চুক্তির উল্লেখ রয়েছে।
নথি অনুযায়ী, পদায়নের পরবর্তী ১৮ মাসের মধ্যে পুরো অর্থ পরিশোধ করার লিখিত অঙ্গীকার করা হয়েছে। এ ছাড়া বিপুল অঙ্কের অর্থের সংস্থান করতে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৪৫ কোটি টাকার তহবিল বা ঋণ সংগ্রহেরও চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
ব্যবসায়ীকে প্রতিনিধি নিয়োগের দাবি
প্রকাশ্যে আসা সম্মতিপত্র অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৯ মার্চ মো. সালাহউদ্দিন আহমেদ—পরিচিতি নম্বর ১৬৫২১—নিজের পদ ও ব্যাচ উল্লেখ করে একটি লিখিত ঘোষণা দেন। এতে চট্টগ্রাম জেলার জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়ন করা হলে তিনি ওই পদে যোগ দিতে সম্মত আছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নথির দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বগা বন্দর এলাকার বাসিন্দা মো. হাবিবুর রহমান নামের এক ব্যবসায়ীকে নিজের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। ওই ব্যবসায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে তার পক্ষে কাজ করবেন বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
একজন বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তার কাঙ্ক্ষিত সরকারি পদায়নের বিষয়ে একজন ব্যবসায়ীকে এভাবে লিখিতভাবে প্রতিনিধি করার বিষয়টি প্রশাসনিক মহলে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
নথির সত্যতা স্বীকারের দাবি
প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গোপন আর্থিক লেনদেন ও সম্মতিপত্রের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদ নথিটির সত্যতা স্বীকার করেছেন। তিনি একটি বিশেষ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন বলেও সূত্রটির দাবি। ভালো একটি স্থানে পদায়ন পাওয়ার উদ্দেশ্যেই তিনি এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড বা স্বাধীন যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে নেই।
চট্টগ্রাম বন্দরে বদলি নিয়েও প্রশ্ন
নথি অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে কর্মরত থাকা অবস্থায় গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর সালাহউদ্দিন আহমেদকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে বদলি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানে তার বদলির পেছনেও আর্থিক লেনদেন ও একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ভূমিকা ছিল।
তবে তার চট্টগ্রাম বন্দরে বদলির ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
বন্দরে যোগদানের পর থেকেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অঞ্চল চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক হওয়ার জন্য তিনি তৎপরতা শুরু করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আচরণবিধি ও সরকারি চাকরি নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে একজন সরকারি কর্মকর্তার পদায়ন প্রক্রিয়ায় এ ধরনের আর্থিক চুক্তি ও তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তদবিরের বিষয়টি সরকারি চাকরির আচরণবিধি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নির্দিষ্ট কোনো জেলায় পদায়নের জন্য আগাম সম্মতিপত্র দেওয়া এবং পদায়ন নিশ্চিত করতে তদবির বা আর্থিক লেনদেনের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য আচরণবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এ ছাড়া সরকারি সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করতে তৃতীয় পক্ষকে প্রতিনিধি হিসেবে ব্যবহার এবং বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের চেষ্টা করা হয়ে থাকলে তা প্রশাসনিক শৃঙ্খলার পাশাপাশি প্রচলিত আইনেও তদন্তের বিষয় হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তবে প্রতিবেদনে উল্লেখিত আইন ও বিধিমালার নির্দিষ্ট ধারা প্রয়োগের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনগত যাচাই ও তদন্তের ওপর নির্ভরশীল।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি জেলার জেলা প্রশাসক পদে নিয়োগ বা পদায়নকে কেন্দ্র করে বিপুল অর্থের চুক্তির অভিযোগের বিষয়টি প্রশাসনের পেশাদারিত্ব ও সরকারি পদায়ন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের দাবি, প্রকাশ্যে আসা নথির সত্যতা, কথিত আর্থিক চুক্তি, তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে যোগাযোগ, ৪৫ কোটি টাকার অর্থসংস্থানের চেষ্টা এবং চট্টগ্রাম বন্দরে বদলির পেছনে কোনো অনিয়ম ছিল কি না—সব বিষয় উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগগুলো তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন ও সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে নথিতে উল্লিখিত আর্থিক চুক্তির প্রকৃত উদ্দেশ্য ও এর সঙ্গে আর কেউ জড়িত কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
এ বিষয়ে মো. সালাহউদ্দিন আহমেদের বিস্তারিত বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।

